প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। এ দিনের মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে জানানো যে আত্মহত্যা প্রায়ই প্রতিরোধযোগ্য, যদি মানসিক কষ্টে থাকা ব্যক্তিরা সময়মতো সহায়তা পান। দিনটি সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক, গণমাধ্যম, পরিবার ও সাধারণ মানুষের কাছে একটি আহ্বান - আত্মহত্যা সম্পর্কে খোলামেলা কথা বলা, মানসিক অসুস্থতা ঘিরে কলঙ্ক ভাঙা এবং সহায়তা চাওয়ার পথ সহজ করা।
History
বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস প্রথম পালিত হয় ২০০৩ সালে, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন (IASP) এর উদ্যোগে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর সহযোগিতায়। এর আগে বিভিন্ন দেশ ও সংগঠন আলাদাভাবে আত্মহত্যা বিষয়ে সচেতনতা কর্মসূচি চালালেও, এ দিবসের মাধ্যমে একটি যৌথ বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয় যেখানে সবাই একই বার্তা দেয় - আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা যায় এবং জীবনের মূল্য আছে।
২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর এ দিবস পালন করা হচ্ছে। প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট থিম নির্ধারণ করা হয়, যেমন একে অন্যের সঙ্গে সংযোগ তৈরি, একসাথে কাজ করা, কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে আশা জাগানো বা কমিউনিটি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা। সারা বিশ্বে র্যালি, আলোচনা সভা, মোমবাতি প্রজ্বলন, প্রশিক্ষণ কর্মশালা, গণমাধ্যম প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
আত্মহত্যা বিশ্বব্যাপী একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতি বছর সাত লক্ষেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে প্রাণ হারায় এবং এর অনেক গুণ বেশি মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বা তীব্র আত্মহত্যাপ্রবণ চিন্তায় ভোগেন। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে শোকাহত পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও কমিউনিটি, যারা অপরাধবোধ, দুঃখ ও অজস্র প্রশ্ন নিয়ে বেঁচে থাকেন।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আত্মহত্যা একক কোনো কারণের ফল নয়। এর পেছনে থাকতে পারে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, নেশাজাতীয় পদার্থের ব্যবহার, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা বা ব্যথা, নির্যাতন বা সহিংসতার অভিজ্ঞতা, আর্থিক বা শিক্ষাগত চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও একাকিত্বের অনুভূতি। অনেকেই নিজেদের আটকে পড়া, আশাহীন বা সবার জন্য বোঝা মনে করেন এবং সমাধান দেখতে না পেয়ে আত্মহত্যার কথা ভাবেন।
তবে প্রমাণ দেখায় যে যথাসময়ে সহায়তা পেলে অনেক আত্মহত্যা ঠেকানো সম্ভব। অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা কোনো এক সময় খুব তীব্র আত্মহত্যাপ্রবণ চিন্তায় ভুগলেও পরবর্তীতে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও ভালোবাসার সহায়তায় সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক ও অর্থবহ জীবনযাপন করছেন। সতর্কতামূলক লক্ষণ দ্রুত চিনতে পারা, মনোযোগ দিয়ে ও বিচার না করে শোনা, প্রাণঘাতী উপায়ের সহজ প্রাপ্যতা কমানো এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো - সব মিলিয়ে আত্মহত্যার ঝুঁকি কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
কলঙ্ক বা স্টিগমা এখনো একটি বড় বাধা। অনেকেই মনে করেন মানসিক রোগ বা আত্মহত্যার কথা বলা লজ্জার বা ধর্মবিরুদ্ধ, কেউ কেউ আবার ভয় পান যে সাহায্য চাইলে অন্যরা তাকে দুর্বল বা অস্বাভাবিক ভাববে। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানসিক কষ্ট নিয়ে কথা বলা ও সাহায্য চাওয়া সাহসিকতার প্রতীক, দুর্বলতার নয়।
মূল তথ্য
আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব
- ২০০৩ সাল থেকে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন (IASP)
- WHO এর সহায়তায় এ দিবসের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।
বিশ্বব্যাপী বোঝা
- প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাত লক্ষেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যায় এবং তরুণদের মৃত্যুর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়।
প্রতিরোধ সম্ভব
- সময়মতো মানসিক সহায়তা
- কার্যকর চিকিৎসা
- সংকট হেল্পলাইন এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা যায়।
সতর্কতা লক্ষণ
- বারবার মরার বা বেঁচে থাকার ইচ্ছা না থাকার কথা বলা
- ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একেবারে আশাহীন হয়ে পড়া
- অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ
- হঠাৎ করে খুব চুপচাপ হয়ে যাওয়া বা আপন জিনিসপত্র বিলিয়ে দেওয়া - সবই সতর্কসংকেত হতে পারে।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশে আত্মহত্যা বিষয়টি এখনো সংবেদনশীল এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ পায় না। ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেকেই এ বিষয় নিয়ে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন, যার ফলে যথাযথ তথ্য ও সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে শহুরে তরুণদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা কিছুটা বেড়েছে।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কান পেতে রই টেলিফোনের মাধ্যমে গোপনীয় ও বিনামূল্যের মানসিক সহায়তা দিয়ে থাকে, যেখানে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীরা সহানুভূতির সাথে মানুষের কথা শোনেন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH), কিছু সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ এবং বেসরকারি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরাও কাউন্সেলিং ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন।
বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও এবং তরুণদের সংগঠনগুলো সেমিনার, ক্যাম্পেইন, টিভি ও রেডিও আলোচনাসভা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বার্তা প্রচার করে। এসব বার্তায় জোর দেওয়া হয় যে বিষণ্নতা ও আত্মহত্যাপ্রবণতা কোনো নৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং চিকিৎসাযোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং এ জন্য সহানুভূতি ও পেশাদার সহায়তা প্রয়োজন।
ব্যক্তি ও পরিবারের জন্য মূল বার্তা হলো, আপনাকে একা লড়াই করতে হবে না। খুব কষ্ট লাগলে বা বেঁচে থাকার ইচ্ছা কমে গেলে বিশ্বস্ত কোনো মানুষ, কাউন্সেলর, ডাক্তার বা হেল্পলাইনের সাথে কথা বলা প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- আত্মহত্যার ঝুঁকির সতর্কতা লক্ষণ কী কী?
- সাধারণ সতর্কতামূলক লক্ষণের মধ্যে রয়েছে বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, বারবার মরতে চাওয়ার বা বেঁচে থাকার ইচ্ছা না থাকার কথা বলা, গভীর হতাশা প্রকাশ করা, ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন, অস্বাভাবিক ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করা এবং নিজের প্রিয় জিনিসপত্র দিয়ে দিতে শুরু করা। এ ধরনের কোনো লক্ষণকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
- আত্মহত্যার কথা ভাবছে বলে সন্দেহ হলে আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি?
- প্রথমে শান্ত থাকুন এবং তাকে বিচার না করে মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনুন। তার কষ্টকে গুরুত্ব দিন এবং সরাসরি জিজ্ঞেস করতে ভয় পাবেন না যে সে কি আত্মহত্যার কথা ভাবছে। ঝুঁকি বেশি মনে হলে তাকে একা রেখে যাবেন না, সম্ভব হলে প্রাণঘাতী উপায়গুলো দূরে রাখুন এবং পরিবার, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, হেল্পলাইন বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ করতে তাকে সহায়তা করুন।
- বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কোথায় পাওয়া যেতে পারে?
- বাংলাদেশে কান পেতে রই নামের আবেগগত সহায়তা হেল্পলাইন গোপনীয়ভাবে মানুষের কথা শোনে এবং মানসিক সমর্থন দেয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, কিছু সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে মনোরোগ বিভাগ রয়েছে, যেখানে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সেবা পাওয়া যায়। অনেক শহরে বেসরকারি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরাও সেবা দিয়ে থাকেন।

