মূল কন্টেন্টে যান

আমরা নিয়মিত তথ্য যোগ ও যাচাই করছি। কোনো তথ্য অনুপস্থিত বা ভুল মনে হলে আমাদের জানান, আমাদের টিম কাজ করছে। জানান

MedIndex
World Heart Day illustration showing a heart made of people walking, eating healthy food, checking blood pressure and avoiding smoking to prevent heart disease

স্বাস্থ্য দিবসSeptember 29

বিশ্ব হৃদয় দিবস

প্রতি বছর ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হৃদয় দিবস পালিত হয়। এ দিনটির মূল লক্ষ্য হলো সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া যে হৃদরোগ ও স্ট্রোক এখন বিশ্বের মৃত্যুর প্রধান কারণ হলেও, সঠিক জীবনযাপন ও সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে এর বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের নেতৃত্বে পালিত এই দিবস সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী ও সাধারণ মানুষকে হৃদয় সুস্থ রাখার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করে।

History

২০০০ সালে ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সহযোগিতায় প্রথম বিশ্ব হৃদয় দিবস চালু করে। শুরুতে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার এ দিবস পালিত হতো, পরে দিনটি নির্দিষ্ট করে ২৯ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়, যাতে প্রতি বছর একই তারিখে সারা বিশ্বে কর্মসূচি নেওয়া যায়। হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণে ক্রমবর্ধমান মৃত্যুহার ও অক্ষমতাকে সামনে আনতেই এ দিবসের সূচনা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব হৃদয় দিবস একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ক্যাম্পেইনে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর আলাদা থিমের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয় – যেমন রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবার ও শরীরচর্চা, ধূমপান ও তামাক বর্জন, জরুরি হৃদরোগ সেবার প্রাপ্যতা, এবং "Know Your Numbers" অর্থাৎ নিজের রক্তচাপ, রক্তে চিনি, কোলেস্টেরল ও ওজন সম্পর্কে সচেতন থাকা। বিশ্বের শতাধিক দেশে মিছিলে অংশগ্রহণ, হেলথ ক্যাম্প, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গণসচেতনতা সভা ও গণমাধ্যম প্রচারের মাধ্যমে এ দিবস পালন করা হয়।

কেন গুরুত্বপূর্ণ

বর্তমানে হৃদরোগ ও স্ট্রোক একত্রে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী। এর মধ্যে অনেক মৃত্যু অল্প বয়সে – ৭০ বছরের আগেই – ঘটে, যা পরিবার ও দেশের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ ফেলে। উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাস্থ্যকর খাবার, অতিরিক্ত লবণ ও তেল, চিনি ও সফট ড্রিঙ্ক, ধূমপান ও পান-সুপারি, বসে থাকা জীবনযাপন, স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ – এ সবই পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকির কারণ, যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলে হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

অনেক ক্ষেত্রেই ছোট ছোট পরিবর্তন বড় পার্থক্য গড়ে তুলতে পারে – প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা শরীরচর্চা, রান্নায় কম লবণ ও কম তেল ব্যবহার, প্যাকেটজাত ও ডিপ ফ্রাই খাবার কম খাওয়া, ধূমপান ও সব ধরনের তামাক ছেড়ে দেওয়া, নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে চিনি মাপা, এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সঠিকভাবে সেবন। যাদের আগে থেকেই হার্টের সমস্যা, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম মেনে চলা হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি আরও কমিয়ে দেয়।

বিশ্ব হৃদয় দিবস মনে করিয়ে দেয়, হৃদয় সুরক্ষা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামষ্টিক দায়িত্বও। হাঁটার জায়গা, পার্ক ও খেলাধুলার সুযোগ তৈরি, স্কুলে স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা, ধূমপানমুক্ত কর্মস্থল ও গণপরিবহন, পরিষ্কার বাতাস এবং সহজলভ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা – সবই হৃদয়বান্ধব সমাজ গঠনের অংশ।

মূল তথ্য

শুরুর বছর

  • ২০০০ সালে ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশন বিশ্ব হৃদয় দিবস চালু করে; পরে ২৯ সেপ্টেম্বরকে নির্দিষ্ট দিন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।

মৃত্যুর প্রধান কারণ

  • প্রতি বছর আনুমানিক ২ কোটি মানুষ হৃদরোগ ও স্ট্রোকে মারা যান
  • যা বৈশ্বিক মৃত্যুর সবচেয়ে বড় একক কারণ।

প্রধান ঝুঁকির কারণ

  • উচ্চ রক্তচাপ
  • ধূমপান ও তামাক
  • অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
  • শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
  • স্থূলতা ও ডায়াবেটিস – এগুলোই হৃদরোগের পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি।

তরুণদের ঝুঁকি

  • স্বল্প ও মধ্যম আয়ের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও তুলনামূলক কম বয়সে – ৪০–৫০ বছরেই – হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের সংখ্যা বাড়ছে।

বাংলাদেশে

বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ কমে এলেও হৃদরোগ ও স্ট্রোকসহ অসংক্রামক ব্যাধি (NCD) দ্রুত বাড়ছে এবং এখন মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস, বিশেষ করে অতিরিক্ত লবণ, ভাজাপোড়া ও ফাস্ট ফুড খাওয়া, কম শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান, বিড়ি ও পান-সুপারি সেবন, মানসিক চাপ ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব – এ সবকিছু মিলেই হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

অনেক সময় লোকজন প্রথমে হালকা বুকে ব্যথা, হাঁটতে গেলে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, পা ফুলে যাওয়া বা খুব সহজে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণকে গুরুত্ব দেন না। আবার হার্ট অ্যাটাকের সময় বুকের মাঝখানে চাপ ধরা ব্যথা, কাঁধ, হাত বা চোয়ালে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া, প্রচুর ঘাম, বমি বমি ভাব – এসব লক্ষণ দেখা দিলেও কেউ কেউ দেরি করে হাসপাতালে যান, যা জীবনহানির ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়।

বর্তমানে ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে কার্ডিওলজি বিভাগ, আইসিইউ, করোনারি কেয়ার ইউনিট (CCU) এবং ক্যাথ ল্যাব (angiography, angioplasty) এর সংখ্যা পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, ট্রপোনিন টেস্ট, লিপিড প্রোফাইল, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সুবিধা রয়েছে। তবে গ্রামাঞ্চল ও উপজেলা পর্যায়ে এখনো বিশেষায়িত হৃদরোগ সেবার অভাব রয়েছে, তাই প্রাথমিক পর্যায়েই রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও ওজন নিয়ন্ত্রণ আরও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব হৃদয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান র‍্যালি, ফ্রি স্ক্রিনিং ক্যাম্প, সেমিনার, টিভি টকশো ও অনলাইন প্রচার আয়োজন করে। সাধারণত বার্তাগুলো হয় – “ধূমপানমুক্ত থাকুন”, “চিনি ও লবণ কমান”, “প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন”, “ওজন স্বাভাবিক রাখুন” এবং “৪০ বছরের পর নিয়মিত হার্ট চেকআপ করুন, বিশেষ করে যদি পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকে।”

ব্যক্তিগতভাবে নিজের ও পরিবারের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি – যেমন নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে চিনি ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা; হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়ামকে দৈনন্দিন রুটিনের অংশ করা; রান্নায় কম লবণ ও কম তেল ব্যবহার; বাজারের ফাস্ট ফুড, ডিপ ফ্রাই, অতিরিক্ত মিষ্টি ও সফট ড্রিঙ্ক কম খাওয়া; ধূমপান ও সব ধরনের তামাক পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া; এবং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে ছুটে যাওয়া। দীর্ঘ সময় ধরে এমন স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখলেই নিজের ও প্রিয়জনের হৃদয় সুরক্ষিত রাখা অনেক সহজ হয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

হৃদরোগের প্রধান ঝুঁকির কারণ কী কী?
উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান ও সব ধরনের তামাক সেবন, অতিরিক্ত লবণ, তেল ও চিনি-যুক্ত অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, স্থূলতা, উচ্চ কোলেস্টেরল, নিয়ন্ত্রণহীন ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ – এগুলোই হৃদরোগের প্রধান পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকির কারণ। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক কমানো যায়।
বাংলাদেশে কি হৃদরোগ বাড়ছে?
হ্যাঁ। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ন, লবণ ও তেলে ভাজা খাবার বেশি খাওয়া, ফাস্ট ফুডের প্রবণতা, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং সিগারেট, বিড়ি ও জর্দা-খয়েরের মতো তামাক পণ্যের ব্যবহার বাড়ায় হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে অনেক মানুষ তুলনামূলক কম বয়সেই – ৪০–৫০ বছর বয়সে – হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন, বিশেষ করে যাদের রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নির্ণয় হয়নি বা নিয়ন্ত্রণে নেই।
দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে হার্ট সুস্থ রাখা যায়?
হার্ট সুস্থ রাখতে হলে ধূমপান ও সব ধরনের তামাক পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, খাবারে অতিরিক্ত লবণ, তেল ও চিনি কমাতে হবে, প্যাকেটজাত ও ডিপ ফ্রাই খাবার কম খেতে হবে, বেশি করে শাকসবজি, ফল ও মাছ খেতে হবে এবং সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনে অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা শরীরচর্চা করতে হবে। পাশাপাশি ওজন স্বাভাবিক রাখা, মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে চিনি ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা আগের হৃদরোগ থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ঠিকমতো খেতে হবে।

সম্পর্কিত স্বাস্থ্য দিবস

এই পাতা শেয়ার করুন