প্রতি বছর ১৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ব সেপসিস দিবস পালিত হয়। এ দিনের উদ্দেশ্য হলো সেপসিস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো – এমন এক অবস্থা যেখানে সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া উল্টো নিজের টিস্যু ও অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দ্রুত প্রাণঘাতী হতে পারে। এই দিবস স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে সেপসিস দ্রুত চিনে ফেলে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে অনেক মৃত্যু ও জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
History
বিশ্ব সেপসিস দিবস ২০১২ সালে গ্লোবাল সেপসিস অ্যালায়েন্স-এর উদ্যোগে চালু হয়। সংক্রমণজনিত জটিলতা হিসেবে সেপসিস বহু বছর ধরেই পরিচিত হলেও, আলাদা একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে এটি আগে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। বিশ্ব সেপসিস দিবস চালুর মাধ্যমে সেপসিস প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ ও মানসম্পন্ন চিকিৎসার ওপর আন্তর্জাতিক মাত্রায় জোর দেওয়া শুরু হয়।
২০১২ সাল থেকে প্রতি বছর ১৩ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কমিউনিটিতে নানা আয়োজনের মাধ্যমে দিবসটি পালিত হচ্ছে। গ্লোবাল সেপসিস অ্যালায়েন্স ও অংশীদার সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক গাইডলাইন প্রচার, জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে সেপসিসকে অগ্রাধিকার দেওয়া, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং সময়মতো নিবিড় পরিচর্যার সুযোগ বাড়ানোর জন্য কাজ করে। অনেক বছরেই থিম হিসেবে মাতৃ ও নবজাতক সেপসিস, স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশে সেপসিস অথবা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের সাথে সেপসিসের সম্পর্কের মতো বিষয় তুলে ধরা হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
সেপসিস এখন একটি বড় বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃত। ধারণা করা হয়, প্রতি বছর প্রায় ৪৯ মিলিয়ন মানুষ সেপসিসে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ১১ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়। যারা বেঁচে যান, তাদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতা, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের সমস্যা বা মানসিক ট্রমার মতো জটিলতায় ভুগতে পারেন, যাকে পোস্ট সেপসিস সিনড্রোম বলা হয়।
যেকোনো সংক্রমণ থেকেই সেপসিস হতে পারে – নিউমোনিয়া বা ফুসফুসের সংক্রমণ, প্রস্রাবের সংক্রমণ, পেটের ইনফেকশন, ত্বক বা ক্ষতের ইনফেকশন, অপারেশনের পর বা প্রসবের পর সংক্রমণ ইত্যাদি। এ অবস্থায় সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শরীরে যে রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়, তা রক্তনালি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গে প্রদাহ সৃষ্টি করে রক্তচাপ কমিয়ে দিতে পারে, ফলে কিডনি, লিভার, ফুসফুস, মস্তিষ্কসহ বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হতে শুরু করে এবং সেপটিক শক তৈরি হতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ চেনা অত্যন্ত জরুরি। সেপসিসের সতর্কতা লক্ষণের মধ্যে রয়েছে খুব দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব বা অস্পষ্ট কথা বলা, খুব বেশি জ্বর বা অস্বাভাবিকভাবে শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, প্রস্রাব খুব কম হওয়া এবং রোগীর “ভীষণ খারাপ লাগা” বা “মনে হচ্ছে কিছু একটা খুবই ভুল হচ্ছে” এমন অনুভূতি। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এসব লক্ষণ অনেক সময় অস্পষ্ট হতে পারে, তাই পরিবার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ খেয়াল রাখা দরকার।
দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারলে অনেক রোগী ভালো হয়ে ওঠেন। সাধারণত অক্সিজেন, শিরায় স্যালাইন (ফ্লুইড), দ্রুত ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ দরকার হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যথাযথ অ্যান্টিবায়োটিক শুরুতে বিলম্ব হলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই বিশ্ব সেপসিস দিবসের অন্যতম বার্তা হলো – সেপসিস হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতোই জরুরি অবস্থা; সামান্য দেরিও বিপজ্জনক হতে পারে।
মূল তথ্য
বৈশ্বিক ক্যাম্পেইন
- ২০১২ সাল থেকে গ্লোবাল সেপসিস অ্যালায়েন্স-এর নেতৃত্বে বিশ্ব সেপসিস দিবস পালিত হচ্ছে।
মহা-ঝুঁকি
- প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৪৯ মিলিয়ন মানুষ সেপসিসে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ১১ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়।
যেকোনো সংক্রমণ থেকে
- ছোট একটি কাটা ক্ষত
- প্রস্রাবের সংক্রমণ
- পেটের ইনফেকশন
- নিউমোনিয়া
- অস্ত্রোপচার বা প্রসব-পরবর্তী ইনফেকশন – সবকিছু থেকেই সেপসিস হতে পারে।
সতর্কতা লক্ষণ
- দ্রুত শ্বাস বা হৃদস্পন্দন
- অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব বা বিভ্রান্তি
- চরম জ্বর বা খুব কম তাপমাত্রা
- প্রস্রাব কম হওয়া এবং ভীষণ অসুস্থ বা অস্থির বোধ করা – এসব লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশে সেপসিস একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা, বিশেষ করে নবজাতক ও ছোট শিশু, বয়স্ক মানুষ, ডায়াবেটিস বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং গুরুতর সংক্রমণে ভোগা রোগীদের জন্য। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, ডেঙ্গু, টাইফয়েড, প্রসবজনিত সংক্রমণ ও অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণ থেকে অনেক সময় সেপসিস তৈরি হতে পারে। দেরিতে হাসপাতালে আসা, আইসিইউ বা নিবিড় পরিচর্যার সীমিত সুযোগ এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স – এসব কারণ ফলাফলকে আরও জটিল করে তোলে।
অনেক সরকারী ও বেসরকারি হাসপাতালে জরুরি বিভাগ ও আইসিইউতে সেপসিস ব্যবস্থাপনার স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকল চালু রয়েছে। চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণে দ্রুত সেপসিস শনাক্ত করা, সময়মতো রক্ত পরীক্ষা, তাড়াতাড়ি অ্যান্টিবায়োটিক শুরু, পর্যাপ্ত স্যালাইন দেওয়া এবং রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ ও অঙ্গের কার্যকারিতা ঘন ঘন পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়।
বিশ্ব সেপসিস দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ, সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ, নার্সিং সংগঠন ও হাসপাতালগুলো সেমিনার, বৈজ্ঞানিক আলোচনা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজন করে। বার্তাগুলোর মধ্যে থাকে হাতে ভালোভাবে সাবান দিয়ে ধোয়া, টিকা গ্রহণ, নিরাপদ প্রসব ও অপারেশন, সংক্রমণের দ্রুত চিকিৎসা এবং অ্যান্টিবায়োটিক যৌক্তিকভাবে ব্যবহার করার গুরুত্ব – যা মিলিয়ে সেপসিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
পরিবারের জন্য মূল বার্তা হলো, কোনো রোগী যদি সংক্রমণ থাকা অবস্থায় হঠাৎ খুব বেশি দুর্বল, বিভ্রান্ত, হাঁপাচ্ছেন বা “একেবারে ভালো লাগছে না” এমন অনুভূতি প্রকাশ করেন, তাহলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক হাসপাতালে পৌঁছানোই সেপসিসের ক্ষেত্রে জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- সেপসিসের কারণ কী?
- সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শরীরের প্রতিক্রিয়া যখন অতিরিক্ত হয়ে নিজের টিস্যু ও অঙ্গের ক্ষতি করে, তখন সেপসিস হয়। নিউমোনিয়া, প্রস্রাবের সংক্রমণ, পেটের ইনফেকশন, ত্বক বা ক্ষতের ইনফেকশন, অপারেশনের পর বা প্রসবের পর সংক্রমণ – প্রায় সব ধরনের ইনফেকশন থেকেই সেপসিস হতে পারে।
- সেপসিসের সতর্কতা লক্ষণ কী কী?
- দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব বা বিভ্রান্তি, খুব বেশি জ্বর বা অস্বাভাবিকভাবে শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, প্রস্রাব খুব কম হওয়া, ত্বক ফ্যাকাশে বা দাগ দাগ হয়ে যাওয়া এবং ‘ভীষণ খারাপ লাগা’ বা ‘মনে হচ্ছে কিছু একটা খুবই ভুল’ – এ ধরনের লক্ষণ সেপসিসের ইঙ্গিত হতে পারে এবং তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা দরকার।
- সেপসিস হলে চিকিৎসা কীভাবে হয়?
- সেপসিসের চিকিৎসা হাসপাতালের জরুরি অবস্থা হিসেবে করা হয়। সাধারণত অক্সিজেন, শিরায় স্যালাইন, যত দ্রুত সম্ভব ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক, রক্ত পরীক্ষা এবং রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ ও বিভিন্ন অঙ্গের কাজ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। গুরুতর সেপসিস বা সেপটিক শকে অনেকের আইসিইউতে নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়।

