মূল কন্টেন্টে যান

আমরা নিয়মিত তথ্য যোগ ও যাচাই করছি। কোনো তথ্য অনুপস্থিত বা ভুল মনে হলে আমাদের জানান, আমাদের টিম কাজ করছে। জানান

MedIndex
World Patient Safety Day illustration showing doctors, nurses, patients and family members around a hospital bed using checklists, hand hygiene and communication to ensure safe medical care

স্বাস্থ্য দিবসSeptember 17

বিশ্ব রোগী সুরক্ষা দিবস

প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব রোগী সুরক্ষা দিবস পালিত হয়। এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া যে চিকিৎসা নিতে গিয়ে কোনো রোগীর অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি বা ঝুঁকির মুখে পড়া উচিত নয়। রোগী, পরিবার, ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষ – সবার অংশগ্রহণে নিরাপদ সেবার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এ দিনের বার্তা।

History

২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সমাবেশ (World Health Assembly) আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব রোগী সুরক্ষা দিবস প্রতিষ্ঠা করে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) একটি সরকারি স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর আগে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় যে অনিরাপদ সেবা ও চিকিৎসাগত ভুল প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী বিপুলসংখ্যক রোগীকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশে। এসব সমস্যার গুরুত্ব তুলে ধরতে এবং সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার জন্য একটি বৈশ্বিক দিবসের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৭ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব রোগী সুরক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী প্রতিটি বছরে ভিন্ন ভিন্ন থিমের মাধ্যমে রোগী সুরক্ষার নানা দিক – যেমন নিরাপদ মা ও নবজাতক সেবা, ওষুধ ব্যবহারের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তা, রোগীর অংশগ্রহণ, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ইত্যাদি – সামনে আনা হচ্ছে। এই দিবসের প্রতীকী রঙ হিসেবে কমলা ব্যবহার করা হয়, যা সতর্কতা, দৃশ্যমানতা ও সাবধানতার প্রতীক; অনেক দেশে হাসপাতাল ও ভবনগুলো এ দিনে কমলা আলোয় আলোকিত করা হয়।

কেন গুরুত্বপূর্ণ

অনিরাপদ সেবা এক ধরনের ‘নীরব মহামারি’। ওষুধের ভুল মাত্রা বা ভুল রোগীর কাছে ওষুধ পৌঁছে যাওয়া, অপারেশনের ভুল, ভুল পরীক্ষা রিপোর্ট, হাসপাতালে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া, প্রেসার সোর বা বেডসোর, সার্জারি বা ইনজেকশনের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া – এসবই রোগী সুরক্ষার ব্যর্থতার উদাহরণ, যার অনেকটাই প্রতিরোধযোগ্য।

এর ফল হয় বহুমুখী – রোগীর হাসপাতালে থাকার সময় বেড়ে যায়, অতিরিক্ত ব্যয় হয়, অনেক সময় স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা তৈরি হয়, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আবার ডাক্তার ও নার্সদের জন্যও গুরুতর দুর্ঘটনা মানসিক চাপ, দুঃখ ও পেশাগত ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ব রোগী সুরক্ষা দিবস মনে করিয়ে দেয় যে প্রশিক্ষণ, সঠিক নীতি, দলগত কাজ, নিরাপদ সিস্টেম ডিজাইন ও খোলামেলা রিপোর্টিং – সব মিলিয়ে বিনিয়োগ করলে তা রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মী – উভয়েরই জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে।

রোগী সুরক্ষা বাড়ানোর মূল কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে: অস্ত্রোপচার ও বিভিন্ন প্রক্রিয়ার আগে-পরের নিরাপত্তা চেকলিস্ট ব্যবহার, ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ লেখা ও প্রয়োগে নির্দিষ্ট প্রোটোকল মানা, নিয়মিত ও সঠিকভাবে সাবান-পানি বা অ্যালকোহল-ভিত্তিক স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়া, রোগী হস্তান্তরের সময় (handover) পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গ যোগাযোগ, এবং কোনো ভুল বা কাছাকাছি এড়ানো দুর্ঘটনা (near miss) হলেও তা নির্ভয়ে রিপোর্ট করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

এছাড়া রোগী ও তাদের পরিবারকে সঙ্গী হিসেবে যুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন – রোগী বা তার স্বজনরা নিজের ওষুধের তালিকা নিয়ে আসা, আগের অ্যালার্জি বা প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ডাক্তারকে জানানো, অপারেশন বা বড় কোনো প্রক্রিয়ার আগে নাম ও পরিচয় মিলিয়ে নেওয়া হচ্ছে কি না খেয়াল করা, কোনো পরীক্ষা বা চিকিৎসা সম্পর্কে না বুঝলে প্রশ্ন করা এবং কিছু ভুল মনে হলে তা সম্মানের সাথে জানিয়ে দেওয়া – এসবই নিরাপত্তার অংশ।

মূল তথ্য

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

  • ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সমাবেশ কর্তৃক বিশ্ব রোগী সুরক্ষা দিবস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং WHO-এর সরকারি স্বাস্থ্য দিবসগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

ক্ষতির ব্যাপকতা

  • প্রতি বছর চিকিৎসাগত ভুল ও অনিরাপদ সেবার কারণে বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হন; এর বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য।

প্রধান অগ্রাধিকার

  • ওষুধ ব্যবহারের নিরাপত্তা
  • অস্ত্রোপচারের নিরাপত্তা
  • সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ
  • নিরাপদ প্রসব ও নবজাতক সেবা
  • নিরাপদ চিকিৎসা সরঞ্জাম ও রিপোর্টিং সিস্টেম – রোগী সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

ক্যাম্পেইন রঙ

  • সতর্কতা ও সাবধানতার প্রতীক হিসেবে এই দিবসে কমলা রঙ ব্যবহার করা হয়; অনেক স্থাপনা ও হাসপাতাল কমলা আলোয় আলোকিত হয়।

বাংলাদেশে

বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি – উভয় ধরনের স্বাস্থ্যসেবার পরিসর দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে ভিড়, পর্যাপ্ত জনবল ঘাটতি, সীমিত আইসিইউ সুবিধা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং ভুল বা জটিলতা রিপোর্ট না করার মতো সমস্যা রোগী সুরক্ষার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

তবে ইতিবাচক পরিবর্তনও হচ্ছে। বেশ কিছু তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে অস্ত্রোপচারের আগে WHO নির্ধারিত সার্জিক্যাল সেফটি চেকলিস্ট প্রয়োগ, হাত ধোয়ার ক্যাম্পেইন, নিরাপদ ইনজেকশন অনুশীলন, হাসপাতালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ (infection prevention and control) টিম গঠনসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণে ক্লিনিক্যাল দক্ষতার পাশাপাশি রোগী সুরক্ষা, নৈতিকতা ও যোগাযোগ দক্ষতার বিষয়গুলো ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশ্ব রোগী সুরক্ষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো সেমিনার, বৈজ্ঞানিক সেশন, পোস্টার প্রেজেন্টেশন ও গণসচেতনতা কার্যক্রম আয়োজন করে। আলোচনায় উঠে আসে – সঠিক রোগ নির্ণয়, পরিষ্কার প্রেসক্রিপশন, পরীক্ষাগার রিপোর্ট মিলিয়ে দেখা, রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা, সম্মানের সাথে সেবা দেওয়া এবং রোগীর মতামত শোনা – এসবই নিরাপদ সেবার অংশ।

রোগী ও পরিবারের জন্য মূল বার্তা হলো: “নিরাপদ সেবা আপনার অধিকার।” নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে জানতে চাওয়া, ওষুধের নাম ও উদ্দেশ্য জেনে নেওয়া, আগের অসুখ ও অ্যালার্জি সম্পর্কে জানানোর মতো বিষয়গুলো কোনোভাবেই ‘বিরক্ত করা’ নয়; বরং এগুলোই হতে পারে জটিলতা এড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে রোগী ও পরিবার প্রশ্ন করতে আত্মবিশ্বাসী বোধ করেন এবং সবাই মিলে নিরাপদ সেবার সংস্কৃতি গড়ে তোলেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বিশ্ব রোগী সুরক্ষা দিবস কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সমাবেশ বিশ্ব রোগী সুরক্ষা দিবসকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সরকারি স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর এ দিবস পালিত হয়।
বিশ্ব রোগী সুরক্ষা দিবসের প্রতীক রঙ কী এবং কেন?
বিশ্ব রোগী সুরক্ষা দিবসের প্রতীক রঙ হলো কমলা। এই রঙ সতর্কতা, সাবধানতা ও দৃশ্যমানতার প্রতীক, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে চিকিৎসা সেবার প্রতিটি ধাপে রোগীর নিরাপত্তার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। অনেক দেশে এ দিন হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ ভবন কমলা আলোতে আলোকিত করা হয়।
রোগী ও তার পরিবার কীভাবে রোগী সুরক্ষা বাড়াতে সাহায্য করতে পারেন?
রোগী ও পরিবার ওষুধের হালনাগাদ তালিকা সঙ্গে রাখা, আগের অ্যালার্জি বা মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ডাক্তারকে জানানো, অপারেশন বা পরীক্ষা আগে নিজের নাম ও পরিচয় মিলিয়ে নেওয়া হচ্ছে কিনা খেয়াল করা, চিকিৎসা বা পরীক্ষার উদ্দেশ্য না বুঝলে প্রশ্ন করা এবং কিছু ভুল বা অস্বাভাবিক মনে হলে সম্মানের সাথে তা জানিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে রোগী সুরক্ষা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। এগুলো রোগীর অধিকার ও নিরাপত্তারই অংশ।

সম্পর্কিত স্বাস্থ্য দিবস

এই পাতা শেয়ার করুন