প্রতি বছর ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস পালিত হয়। এ দিনটি লুই পাস্তুরের মৃত্যুবার্ষিকীকে স্মরণ করে, যিনি প্রথম কার্যকর জলাতঙ্ক টিকা উদ্ভাবন করেছিলেন। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো মানুষকে জানানো যে জলাতঙ্ক একটি প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী রোগ হলেও, পশুর কামড়ের পর সঠিকভাবে ক্ষত ধোয়া ও সময়মতো টিকা নিলে এটি ১০০% প্রতিরোধ করা সম্ভব।
History
২০০৭ সালে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর রেবিস কন্ট্রোল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা – যেমন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (WOAH) ও FAO – এর সহযোগিতায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস চালু করে। লক্ষ্য ছিল বিশ্বব্যাপী একদিনে একযোগে সচেতনতা বাড়ানো, কুকুরের টিকাদান বাড়ানো এবং মানুষের জন্য জীবনরক্ষাকারী টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো করা।
হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে জলাতঙ্ককে ভয়াবহ এক রোগ হিসেবে জানা যায়, যার লক্ষণের মধ্যে থাকে অস্থিরতা, পানি ভীতি (hydrophobia), খিঁচুনি ও অবশেষে মৃত্যু। একবার লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু লুই পাস্তুরের উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনসহ বর্তমানের আধুনিক টিকাব্যবস্থার কারণে এখন পশুর কামড়ের পরই ব্যবস্থা নিলে জলাতঙ্ক সম্পূর্ণ এড়ানো যায়। দুঃখজনকভাবে সচেতনতার অভাব, বিলম্বিত চিকিৎসা ও টিকার সীমিত প্রাপ্যতার কারণে এখনো অনেক মানুষ, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলো, এই প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা যান।
“জিরো বাই ৩০” (Zero by 30) – অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরবাহিত মানব জলাতঙ্কজনিত মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনার বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ দিনে কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি, স্কুল ও কমিউনিটিতে সচেতনতামূলক শিক্ষা, স্বাস্থ্যকর্মী ও ভেটেরিনারি প্রশিক্ষণ এবং জাতীয় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পক্ষে জনমত গড়ে তোলার মতো কাজ হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
জলাতঙ্ক এমন এক রোগ, যার লক্ষণ একবার শুরু হলে প্রায় সব ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটে। কিন্তু কামড় বা আঁচড় লাগার পরপরই সঠিকভাবে ক্ষত পরিষ্কার করে এবং পূর্ণ টিকা কোর্স সম্পন্ন করলে রোগটি পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। সাধারণত জলাতঙ্ক ভাইরাস সংক্রমিত কুকুরের লালা থেকে ছড়ায়, তবে বিড়াল, শিয়াল, বন্য প্রাণী বা বাদুড় থেকেও সংক্রমণ হতে পারে। শিশুদের ঝুঁকি বেশি, কারণ তারা প্রায়ই কুকুর-বিড়ালের সাথে খেলে ও কামড় বা আঁচড়ের ঘটনা সব সময় বড়দের জানায় না।
প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী আনুমানিক কয়েক দশ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যায়, যাদের বেশিরভাগই এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র, গ্রামাঞ্চল ও অনুন্নত এলাকায় বসবাস করেন। তিনটি সহজ পদক্ষেপ নিলেই বেশিরভাগ মৃত্যু এড়ানো সম্ভব – (১) কামড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থান সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে কমপক্ষে ১৫ মিনিট ধুয়ে ফেলা, (২) যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, এবং (৩) চিকিৎসকের পরামর্শমতো সব ডোজের জলাতঙ্ক টিকা (এবং প্রয়োজনে ইমিউনোগ্লোবুলিন) সম্পূর্ণ করা।
বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস মনে করিয়ে দেয় যে, কুসংস্কার বা ভেষজ চিকিৎসা, ক্ষতে মরিচ, তেল, মাটি বা অন্য কিছু লাগানো জলাতঙ্ক প্রতিরোধ করতে পারে না; বরং ক্ষতি বাড়াতে পারে। নিরাপদ উপায় কেবল বৈজ্ঞানিক প্রথম চিকিৎসা ও সময়মতো টিকা।
মূল তথ্য
স্মরণ দিবস
- ২৮ সেপ্টেম্বর – লুই পাস্তুরের মৃত্যুবার্ষিকীতে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস পালিত হয়।
মৃত্যুর বোঝা
- প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ৫৯
- ০০০ মানুষ জলাতঙ্কে মারা যান
- যাদের অধিকাংশ এশিয়া ও আফ্রিকায়।
প্রধান বাহক কুকুর
- মানুষের মধ্যে জলাতঙ্ক সংক্রমণের প্রায় ৯৯% কুকুরের কামড়ের মাধ্যমে ঘটে।
সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য
- লক্ষণ শুরু হলে প্রায় সবসময় মৃত্যু হলেও
- পশুর কামড়ের পর সঠিকভাবে ক্ষত ধুয়ে সম্পূর্ণ টিকা নিলে জলাতঙ্ক ১০০% প্রতিরোধ করা যায়।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশে রাস্তার বা আধা গৃহপালিত কুকুরের সংখ্যা বেশি হওয়ায় কুকুরের কামড় একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। শহরের বস্তি এলাকা ও গ্রামাঞ্চলে শিশুদের বাইরে খেলাধুলার সময় কুকুর বা বিড়াল কামড়ানো খুব অস্বাভাবিক নয়। অতীতে সচেতনতার ঘাটতি, পর্যাপ্ত টিকার অভাব ও কুসংস্কারের কারণে অনেক মানুষ জলাতঙ্কে মারা গেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচির আওতায় নির্দিষ্ট সরকারি হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল ও অনেক উপজেলায় বিনামূল্যে কামড়-পরবর্তী (post exposure) জলাতঙ্ক টিকা দেওয়া হয়। কুকুর বা বিড়াল যে-ই কামড়াক, পরামর্শ হলো: যত দ্রুত সম্ভব ক্ষতস্থান সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে কমপক্ষে ১৫ মিনিট ধুয়ে ফেলুন, ক্ষতে কোনো প্রকার মাটি, তেল, মলম বা ভেষজ পদার্থ লাগাবেন না, এবং দেরি না করে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে গিয়ে টিকা নিন।
বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস উপলক্ষে স্বাস্থ্য অধিদফতর, ভেটেরিনারি বিভাগ, স্থানীয় সরকার ও বিভিন্ন এনজিও কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি, স্কুলভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম, লিফলেট ও মিডিয়া প্রচারের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ায়। বিশেষ করে বাবা-মা ও অভিভাবকদের শেখানো হয় যে, ছোট ক্ষত বা আঁচড় হলেও সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং “কিছু হবে না” ভেবে বসে থাকা যাবে না।
বাংলাদেশে মূল বার্তা হলো – “কুকুর কামড়ালেই টিকা, দেরি নয় কোনো।” সামান্য কামড় বা আঁচড়কে হালকাভাবে না নিয়ে অবিলম্বে ক্ষত ধোয়া, দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়া এবং সব ডোজের টিকা সম্পূর্ণ নেওয়াই জলাতঙ্ক থেকে বাঁচার একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- কুকুর বা বিড়াল কামড়ালে সঙ্গে সঙ্গে কী করা উচিত?
- ক্ষতস্থান যত দ্রুত সম্ভব সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। খুব জোরে ঘষবেন না, যাতে টিস্যু আরও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ক্ষতে মাটি, মরিচ, তেল বা ভেষজ কিছু লাগাবেন না। ধোয়ার পর দেরি না করে কাছের হাসপাতালে বা জলাতঙ্ক টিকা দেওয়া হয় এমন কেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নেওয়া শুরু করুন।
- বাংলাদেশে জলাতঙ্ক টিকা কি বিনামূল্যে?
- হ্যাঁ। বাংলাদেশে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচির আওতায় অনেক সরকারি হাসপাতালে ও নির্দিষ্ট কেন্দ্রে কামড়-পরবর্তী (post exposure) জলাতঙ্ক টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। কুকুর বা বিড়াল কামড়ালে বা আঁচড়ালেই দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে গিয়ে টিকা নিতে হবে।
- ছোট কামড় বা আঁচড়ও কি ঝুঁকিপূর্ণ?
- হ্যাঁ, একেবারে ছোট কামড় বা আঁচড়ও যদি চামড়া ফেটে যায় বা সামান্য রক্ত বের হয়, বিশেষ করে মুখমণ্ডল, হাত বা গলার কাছে হলে, জলাতঙ্কের ঝুঁকি থাকে। তাই “ছোট ক্ষত, কিছু হবে না” ভেবে বসে থাকা বিপজ্জনক। যেকোনো কামড় বা আঁচড়কে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ক্ষত ধুয়ে চিকিৎসা নিতে হবে।

