প্রতি বছর ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব অ্যালঝাইমার দিবস পালিত হয়, যাতে অ্যালঝাইমার রোগ ও অন্যান্য ডিমেনশিয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে সামনে আনা যায়। অ্যালঝাইমার হলো সবচেয়ে সাধারণ ডিমেনশিয়া, যেখানে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে এবং স্মৃতিশক্তি, চিন্তা করার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা কমে যায়। বিশ্বজুড়ে মানুষের আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে, যা পরিবার, সমাজ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
ডিমেনশিয়া সম্পর্কে এখনো অনেক ভুল ধারণা ও কুসংস্কার আছে। অনেকেই মনে করেন, বেশি ভুলে যাওয়া বা একা কিছুই সামলাতে না পারা বার্ধক্যের “স্বাভাবিক” অংশ; আসলে তা নয়। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কের কোষ ক্রমশ নষ্ট হতে থাকে, ফলে তিনি প্রায়ই একই কথা বারবার জিজ্ঞেস করেন, পরিচিত জায়গায় পথ হারিয়ে ফেলেন, জিনিসপত্র নিরাপদে রাখার জায়গা ভুলে যান, হঠাৎ রাগান্বিত, সন্দেহপ্রবণ বা চুপচাপ হয়ে পড়েন, টাকা–পয়সা বা গৃহস্থালির হিসাব–নিকাশ সামলাতে পারেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গোসল, খাওয়া, কাপড় পরা, টয়লেট ব্যবহারসহ নিত্যদিনের কাজে অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন বাড়ে।
বর্তমানে এমন কোনো ওষুধ নেই যা অ্যালঝাইমার রোগকে পুরোপুরি সারিয়ে তোলে; তবে সময়মতো সঠিক রোগনির্ণয় হলে অনেক কিছু করা সম্ভব—যেমন অন্য কোনো কারণ (ডিপ্রেশন, থাইরয়েড সমস্যা, ভিটামিনের অভাব, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া) আছে কি না দেখা, প্রয়োজনে উপসর্গ–নিয়ন্ত্রণে কিছু ওষুধ শুরু করা, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা এবং রোগী ও পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সেবাযত্নের পরিকল্পনা করা। সহানুভূতিশীল ব্যবহার, সহজ ভাষায় কথা বলা, নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলা, নিরাপদ বাড়ির পরিবেশ গড়ে তোলা ও মানসিক সমর্থন দেওয়া—এসবই জীবনমান অনেকটাই ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে। বিশ্ব অ্যালঝাইমার দিবস মনে করিয়ে দেয়, ডিমেনশিয়ায় ভোগা মানুষ লজ্জা বা অবহেলার নয়, বরং সম্মান ও সহমর্মিতার দাবিদার।
History
জার্মান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যালয়িস অ্যালঝাইমার ১৯০০–এর দশকের শুরুতে এক নারীর দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিভ্রংশ ও বিভ্রান্তির কেস পর্যবেক্ষণ করে তার মৃত্যুর পর মস্তিষ্ক পরীক্ষা করেন এবং সেখানে বিশেষ ধরণের প্রোটিন জমা ও পরিবর্তন দেখতে পান। সেখান থেকেই অ্যালঝাইমার রোগের বৈজ্ঞানিক বর্ণনা শুরু হয়। পরবর্তী গবেষণায় মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক প্রোটিন প্ল্যাক ও ট্যাংলস–এর সঙ্গে এ রোগের সম্পর্ক পরিষ্কার হয়েছে।
ডিমেনশিয়া নিয়ে বৈশ্বিক সচেতনতা বাড়াতে ও কলঙ্ক কমাতে ১৯৯০–এর দশকে আন্তর্জাতিক সংগঠন Alzheimer’s Disease International (ADI) বিশ্ব অ্যালঝাইমার দিবস চালু করে। পরবর্তীতে অনেক দেশে পুরো সেপ্টেম্বর মাসকে বিশ্ব অ্যালঝাইমার মাস হিসেবে পালন করা শুরু হয়, যেখানে ২১ সেপ্টেম্বর মূল দিবস হিসেবে গুরুত্ব পায়। প্রতি বছর “Know Dementia, Know Alzheimer’s” বা “Let’s Talk About Dementia”–এর মতো থিম দিয়ে সহজ ভাষায় প্রচারণা চালানো হয়, যাতে মানুষ খোলামেলা কথা বলতে ও দ্রুত চিকিৎসা নিতে উৎসাহ পায়।
Key facts
সাধারণ কিন্তু কম চেনা রোগ
- ডিমেনশিয়ায় ভোগা মানুষের বড় অংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বাস করে
- কিন্তু সঠিক রোগনির্ণয় ও সেবাযত্নের ব্যবস্থা সীমিত।
বয়সের সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ে
- বয়স বাড়ার সঙ্গে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ে
- তবে যে কেউ বয়স্ক হলেই যে অ্যালঝাইমারে ভুগবেন
- তা নয়।
পরিবারের ওপর প্রভাব
- বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাড়ির সদস্যরা—প্রধানত নারী—দিন–রাত সেবাযত্ন করেন
- যা শারীরিক–মানসিক চাপ ও আর্থিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
ঝুঁকি কমানোর উপায়
- রক্তচাপ
- ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা
- ধূমপান না করা
- নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম
- পুষ্টিকর খাবার
- মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা (পড়া, লেখা, নতুন কিছু শেখা)
- সামাজিকভাবে যুক্ত থাকা এবং মাথায় আঘাত থেকে সতর্ক থাকা—এসব অভ্যাস ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
সহায়তার প্রয়োজন
- রোগী ও কেয়ারগিভারদের জন্য সহজ ভাষায় তথ্য
- নিয়মিত ডাক্তার দেখানো
- কাউন্সেলিং
- সাপোর্ট গ্রুপ ও কমিউনিটি–ভিত্তিক সেবার ব্যবস্থা খুব দরকার।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশে জনসংখ্যায় বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে অ্যালঝাইমারসহ বিভিন্ন ধরনের ডিমেনশিয়ার সমস্যাও বাড়ছে, যদিও প্রায়ই এগুলোর সঠিক পরিসংখ্যান মেলে না। অনেকে লক্ষ্য করেন যে বয়স্ক বাবা–মা বা দাদা–দাদী–নানা–নানী বারবার একই প্রশ্ন করছেন, নিজের জিনিস কোথায় রেখেছেন তা মনে করতে পারছেন না, টাকা গুনতে গিয়ে ভুল করছেন, আত্মীয়–স্বজনকে চিনতে ভুল করছেন বা হঠাৎ কেমন সন্দেহপ্রবণ বা আক্রমণাত্মক হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এসব পরিবর্তনকে প্রায়ই “বুড়ো মানুষের ভুলো মন”, “জিনের ভর”, বা “মানসিক দুর্বলতা” বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
বিশ্ব অ্যালঝাইমার দিবসে বাংলাদেশে নিউরোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট, জেরিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞ, মানসিক স্বাস্থ্য সংগঠন ও এনজিওগুলো সেমিনার, টকশো, সচেতনতামূলক আলোচনা ও কেয়ারগিভার মিটিং আয়োজন করে। বার্তা থাকে—যদি স্মৃতিভ্রংশ বা আচরণগত পরিবর্তন দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সমস্যা তৈরি করে, তাহলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যেতে হবে এবং ডিপ্রেশন, থাইরয়েড সমস্যা, ভিটামিনের অভাব বা অন্য কোনো শারীরিক কারণ আছে কি না তা পরীক্ষা করতে হবে।
কমিউনিটি পর্যায়ে বোঝানো হয় যে ডিমেনশিয়া কোনো পাপের শাস্তি বা “পাগলামী” নয়; এটি একটি শারীরিক–মানসিক অসুস্থতা, যার জন্য সহানুভূতিশীল যত্ন দরকার। ঘরের ভেতর পর্যাপ্ত আলো, ফাঁদসদৃশ কার্পেট বা তার সরিয়ে ফেলা, দরজায়–আলমারিতে লেবেল লাগানো, নিয়মিত সময়ে খাওয়া–ঘুমের ব্যবস্থা, রোগীকে হাটাহাঁটি ও সহজ সামাজিক মেলামেশায় উৎসাহিত করা—এসব ছোট ছোট পরিবর্তনে নিরাপত্তা ও স্বস্তি বাড়ে। একই সঙ্গে কেয়ারগিভারদের বিশ্রাম, মানসিক সমর্থন ও প্রয়োজনে পারিবারিক দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়।
বিশ্ব অ্যালঝাইমার দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাংলাদেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য বয়স–বান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, ডিমেনশিয়া–বিষয়ক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী এবং পরিবার–কমিউনিটি পর্যায়ে সম্মানজনক ও সহমর্মিতাপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- অ্যালঝাইমার রোগ কী?
- অ্যালঝাইমার রোগ হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্কের অসুস্থতা এবং ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ, যেখানে ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তি, আচরণ ও দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা নষ্ট হতে থাকে, বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে।
- বারবার ভুলে যাওয়া কি স্বাভাবিক বার্ধক্য?
- হালকা ভুলে যাওয়া অনেক সময় বয়স বাড়ার স্বাভাবিক অংশ হতে পারে; কিন্তু বারবার একই প্রশ্ন করা, পরিচিত জায়গায় পথ হারিয়ে ফেলা, খুব কাছের মানুষের নাম ভুলে যাওয়া, টাকা–পয়সা বা ঘরের কাজ সামলাতে না পারা কিংবা আচরণে বড় পরিবর্তন দেখা দিলে তা ডিমেনশিয়ার লক্ষণ হতে পারে এবং ডাক্তারের কাছে যাওয়া জরুরি।
- ডিমেনশিয়ায় ভোগা পরিবারের সদস্যকে বাড়িতে কীভাবে সহায়তা করা যায়?
- নির্দিষ্ট দৈনন্দিন রুটিন রাখা, ধীরে ও সহজ ভাষায় কথা বলা, ঘরের দরজা–আলমারিতে লেবেল লাগানো, ঘর আলো–বাতাস ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হালকা হাঁটা ও সামাজিক মেলামেশায় উৎসাহিত করা, নিয়মিত ডাক্তার দেখানো এবং সেবাযত্নের দায়িত্ব পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া—এসব পদক্ষেপ রোগী ও কেয়ারগিভার উভয়ের জন্য উপকারী।

