মূল কন্টেন্টে যান

আমরা নিয়মিত তথ্য যোগ ও যাচাই করছি। কোনো তথ্য অনুপস্থিত বা ভুল মনে হলে আমাদের জানান, আমাদের টিম কাজ করছে। জানান

MedIndex
World Autism Awareness Day illustration with puzzle pieces, blue ribbon, diverse children and support symbols

স্বাস্থ্য দিবসApril 2

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস

প্রতি বছর ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস পালিত হয়। ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এ দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে, যাতে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে (ASD) আক্রান্ত শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের সম্পর্কে সচেতনতা, বোঝাপড়া এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো যায়। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস পালিত হয় এবং এরপর থেকে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, স্কুল ও পরিবারগুলো প্রতি বছর নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার একটি স্নায়ুবিক ও বিকাশজনিত অবস্থা, যা একজন মানুষের যোগাযোগ, সামাজিক মেলামেশা, আচরণ ও ইন্দ্রিয়গত অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। একে “স্পেকট্রাম” বলা হয়, কারণ কারও লক্ষণ ও সহায়তার প্রয়োজন অনেক কম, আবার কারও বেশি হতে পারে। অনেক অটিস্টিক ব্যক্তির স্মৃতিশক্তি, খুঁটিনাটি মনে রাখার ক্ষমতা, প্যাটার্ন ধরার দক্ষতা বা সৎ ও সরলভাবে কথা বলার মতো শক্তি থাকে; আবার সামাজিক নিয়ম বোঝা, ভিড় বা শব্দ সহ্য করা, রুটিন বদলানো বা কথা দিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করতে সমস্যা হতে পারে।

বিশ্বব্যাপী গড়ে প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ১ জনকে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত বলে ধরা হয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে অনেক শিশুর অটিজম নির্ণয়ই হয় না, বা অনেক দেরিতে হয়। অনেক সময় এসব শিশুকে “জেদি”, “একগুঁয়ে” বা “বুদ্ধি কম” ভেবে ভুল বোঝা হয়। এর ফলে স্কুল থেকে বাদ পড়া, বন্ধুদের দ্বারা উপহাস, এমনকি পরিবারের ভেতরেও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি প্রাথমিক স্ক্রিনিং, পরিবারভিত্তিক সহায়তা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং নিউরোডাইভারজেন্সকে মানবাধিকার ও বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বার্তা দেয়।

ইতিহাস

২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একটি প্রস্তাব গৃহীত করে ২ এপ্রিলকে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। লক্ষ্য ছিল—অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা-চাকরিসহ সমাজের সব ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সদস্য দেশগুলোকে নীতি ও সেবায় অটিজমকে অগ্রাধিকার দিতে উৎসাহিত করা। ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছর বিভিন্ন থিমের মাধ্যমে দিবসটি পালিত হচ্ছে; এসব থিমের মধ্যে রয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, কমিউনিটি সাপোর্ট, পরিবার ও অভিভাবক সহায়তা ইত্যাদি।

বিশ্বের বহু দেশ ও শহরে এ দিনে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নীল আলোয় আলোকিত করা হয়, যা অটিজম সচেতনতার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সংস্থা বাস্তব অটিস্টিক শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের গল্প তুলে ধরে, সম্মানজনক ভাষা ব্যবহারের আহ্বান জানায় এবং ভুল ধারণা—যেমন “ভ্যাকসিন থেকে অটিজম হয়”—এসব বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে।

মূল তথ্য

অটিজম কী

  • আজীবন স্থায়ী একটি স্নায়ুবিক বিকাশজনিত অবস্থা
  • যা সামাজিক যোগাযোগ
  • কথা বলা
  • আচরণ
  • আগ্রহের ধরন ও ইন্দ্রিয়গত অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। এটি খারাপ লালন-পালন বা “মায়ের দোষে” হয় না।

কতটা সাধারণ

  • বিশ্বব্যাপী গড় হিসেবে প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ১ জনকে অটিজম স্পেকট্রামে ধরা হয়
  • যদিও নির্ণয়ের সীমাবদ্ধতায় প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।

প্রাথমিক লক্ষণ

  • চোখে চোখ না রাখা
  • নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া
  • বয়স অনুযায়ী কথা বলতে দেরি
  • একই কাজ বারবার করা (যেমন হাত নাড়া, খেলনা এক সারিতে সাজানো)
  • রুটিন বদলালে অস্থির হয়ে পড়া
  • শব্দ–আলো–স্পর্শে অস্বাভাবিক অসহিষ্ণুতা
  • অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলতে বা আগ্রহ ভাগ করতে না চাওয়া ইত্যাদি।

চিকিৎসা ও সহায়তা

  • অটিজম “সারিয়ে তোলার” মতো কোনও ওষুধ নেই; তবে প্রাথমিক পর্যায়ে স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি
  • অকুপেশনাল থেরাপি
  • আচরণভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন
  • প্যারেন্ট ট্রেনিং এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক স্কুলের সহায়তা শিশুর যোগাযোগ
  • শেখা ও দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা অনেক বাড়াতে পারে।

পরিবারের প্রভাব

  • অনেক অভিভাবক মানসিক চাপ
  • আর্থিক ব্যয় ও সামাজিক কুসংস্কারের মুখোমুখি হন। কাউন্সেলিং
  • প্যারেন্ট সাপোর্ট গ্রুপ ও কিছুটা “রেসপাইট কেয়ার” বা বিশ্রামের সুযোগ তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে

বাংলাদেশে গত এক দশকে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকার অটিজম ও নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার নিয়ে জাতীয় নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল, সূচনা ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন অটিজম রিসোর্স সেন্টার ও বেসরকারি সংস্থা মিলে স্ক্রিনিং টুল, নির্ণয় সেবা, শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবক সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

তবে বাস্তবে বেশিরভাগ বিশেষায়িত সেবা—যেমন গঠনমূলক প্রাথমিক হস্তক্ষেপ, স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি ও বহুবিষয়ক মূল্যায়ন—মূলত ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতেই সীমিত। অনেক গ্রামীণ পরিবারকে শহরে যেতে হয়, যা সময় ও খরচসাপেক্ষ। এখনও বহু ক্ষেত্রে মানুষ অটিজমকে “অভিশাপ”, “জিনের সমস্যা” বা “মায়ের দোষ” বলে ভাবেন এবং প্রথমে ঝাড়ফুঁক বা বিকল্প উপায়ে যান, ফলে নির্ণয় ও সহায়তা পেতে দেরি হয়।

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসে বাংলাদেশে মন্ত্রণালয়, স্কুল, হাসপাতাল, অভিভাবক সংগঠন ও প্রতিবন্ধী অধিকার বিষয়ক সংস্থাগুলো র‌্যালি, নীল রঙের পোশাক বা আলো ব্যবহার, সেমিনার, টক শো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শিশু–অভিভাবক অংশগ্রহণমূলক কর্মসূচির আয়োজন করে। এসব আয়োজনে মূল বার্তা থাকে—প্রাথমিক লক্ষণ চিনে দ্রুত বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া, শিশুকে লুকিয়ে না রেখে সম্মানের সাথে সমাজে যুক্ত রাখা, সাধারণ স্কুলগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা এবং অটিস্টিক কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

শিশুদের মধ্যে অটিজমের প্রাথমিক লক্ষণ কী কী?
প্রাথমিক লক্ষণের মধ্যে থাকতে পারে চোখে চোখ না রাখা, নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া, বয়স অনুযায়ী কথা বলতে দেরি, একই কথা বা কাজ বারবার করা, খেলনা এক সারিতে সাজানো, রুটিন বদলালে খুব অস্থির হয়ে যাওয়া, শব্দ–আলো–স্পর্শে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এবং অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলার আগ্রহ কম থাকা।
কোন বয়স থেকে সাধারণত অটিজম ধরা যায়?
অনেক সময় ১২–১৮ মাস বয়স থেকেই কিছু পার্থক্য বোঝা যায় এবং সাধারণত ২–৩ বছর বয়সে নির্ভরযোগ্যভাবে অটিজম নির্ণয় করা সম্ভব। অভিভাবক যদি সন্তানের কথা বলা, বোঝা বা আচরণ নিয়ে চিন্তিত হন, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞের সাথে দেখা করা উচিত।
অটিজম কি খারাপ লালন-পালন বা ভ্যাকসিনের কারণে হয়?
না। অটিজম খারাপ লালন-পালনের জন্য হয় না এবং বড় বড় বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ভ্যাকসিন ও অটিজমের মধ্যে কোনও সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, জিনগত ও মস্তিষ্কের প্রাথমিক বিকাশজনিত নানা কারণে অটিজম দেখা দেয়।
অটিজম আক্রান্ত শিশু কি সাধারণ স্কুলে পড়তে পারে?
অনেক অটিজম আক্রান্ত শিশু উপযুক্ত সহায়তা পেলে সাধারণ স্কুলেই পড়তে পারে। যেমন—ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ক্লাসে কিছু সুবিধা (কম শব্দ, ভিজ্যুয়াল সাপোর্ট ইত্যাদি) এবং প্রয়োজনে শ্যাডো টিচার বা বিশেষ শিক্ষকের সহায়তা। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা অটিস্টিক ও নন-অটিস্টিক দুই ধরনের শিশুর মধ্যেই সহনশীলতা ও সহযোগিতা বাড়ায়।
বাংলাদেশে অটিজমের জন্য কী ধরনের সহায়তা পাওয়া যায়?
বাংলাদেশে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস, কিছু সরকারি হাসপাতাল, বিশেষায়িত অটিজম সেন্টার, এনজিও ও বেসরকারি থেরাপি সেন্টারে মূল্যায়ন, স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, আচরণগত থেরাপি ও প্যারেন্ট ট্রেনিংয়ের মতো সেবা পাওয়া যায়, যদিও এগুলোর বেশিরভাগই বড় শহরকেন্দ্রিক এবং সবার নাগালে আনা এখনও একটি চ্যালেঞ্জ।

সম্পর্কিত স্বাস্থ্য দিবস

এই পাতা শেয়ার করুন