প্রতি বছর ১৭ মে বিশ্ব উচ্চরক্তচাপ দিবস পালিত হয়, যাতে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনকে একটি নীরব কিন্তু মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়। এ উদ্যোগের মূল নেতৃত্ব দেয় ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লিগ (World Hypertension League), যার সঙ্গে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব হাইপারটেনশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
উচ্চ রক্তচাপকে প্রায়ই ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, কারণ অনেক সময় কোনো লক্ষণই থাকে না, অথচ ধীরে ধীরে হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক, কিডনি ও রক্তনালিতে ক্ষতি হতে থাকে। নিয়ন্ত্রণহীন উচ্চ রক্তচাপ হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, হার্ট ফেইলিউর, কিডনি বিকল, চোখের দৃষ্টি নষ্ট হওয়া এবং স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক মানুষ জানেই না যে তাদের রক্তচাপ বেশি; আবার যাদের ধরা পড়ে, তাদেরও অনেকে নিয়মিত ওষুধ সেবন ও ফলো-আপ না করার কারণে কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারেন না।
অতিরিক্ত লবণ খাওয়া, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম কম হওয়া, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, মানসিক চাপ, ধূমপান, অ্যালকোহল সেবন, বয়স বৃদ্ধি ও পারিবারিক ইতিহাস—এসবই উচ্চ রক্তচাপের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। আবার ডায়াবেটিস, রক্তে চর্বি বা কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া এবং কিডনির রোগ থাকলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি আরও বাড়ে। বিশ্ব উচ্চরক্তচাপ দিবস মনে করিয়ে দেয়, রক্তচাপ মাপা খুব সহজ ও কম খরচের একটি পরীক্ষা, কিন্তু সময়মতো শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অসংখ্য হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব।
History
ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লিগ ২০০০–এর দশকের শুরুতে বিশ্ব উচ্চরক্তচাপ দিবস চালু করে, যাতে সাধারণ মানুষ উচ্চ রক্তচাপের গুরুত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পায় এবং সারা বিশ্বে এটি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের হার বাড়ে। বছরের পর বছর এ দিবসের স্লোগানগুলো ঘুরে ফিরে এসেছে “Know Your Numbers” (আপনার রক্তচাপ জানুন), “Healthy Blood Pressure – Healthy Heart” ইত্যাদি থিম নিয়ে, যেখানে সবাইকে নিয়মিত রক্তচাপ মাপতে ও প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করা হয়।
বিশ্ব উচ্চরক্তচাপ দিবস বৈশ্বিক অসংক্রামক রোগ (NCD) প্রতিরোধ কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষ করে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোক কমানোর ক্ষেত্রে। WHO যেভাবে অকালমৃত্যু কমানোর লক্ষ্যে রক্তচাপ, তামাক, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিচ্ছে, এ দিবস তা আরও শক্তিশালী করে।
Key facts
লক্ষণহীন
- উচ্চ রক্তচাপ থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষের কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না; শুধু মাথা ব্যথা বা মাথা ঘোরা থাকলেই যে রক্তচাপ বেশি
- তা সব সময় ঠিক নয়।
নির্ণয়
- সাধারণত কয়েক দিন বা ভিন্ন সময়ে একাধিকবার সঠিকভাবে রক্তচাপ মেপে
- নির্দিষ্ট সীমার ওপরে থাকলে হাইপারটেনশন হিসেবে ধরা হয়।
পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি
- খাবারে লবণ কমানো
- শাকসবজি ও ফল বেশি খাওয়া
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
- নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম
- ধূমপান না করা এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা—এসব অভ্যাস রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
চিকিৎসা
- উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেক নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধ রয়েছে; এগুলো প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদে প্রতিদিন নিয়মিত খেতে হয় এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে একত্রে ভালো কাজ করে।
দীর্ঘমেয়াদি ফলো-আপ
- নির্দিষ্ট সময় পরপর ডাক্তার দেখানো
- রক্তচাপ মাপা
- ওষুধ ও ডোজ ঠিক আছে কি না দেখা এবং জটিলতা আছে কি না পরীক্ষা করা—ভালো নিয়ন্ত্রণের জন্য খুব জরুরি।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। দ্রুত নগরায়ন, কম হাঁটা–চলা, সিঁড়ি ব্যবহার না করে সব কাজে লিফট বা যানবাহনের ওপর নির্ভরতা, সাদা ভাত ও অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া, ভাজাপোড়া ও ফাস্ট ফুডের চল, মানসিক চাপ ও ঘুমের অনিয়ম—সব মিলিয়ে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গ্রাম–শহর সব জায়গায়ই অনেক মানুষ নিয়মিত রক্তচাপ মাপেন না; অনেক সময় প্রথমবার উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা অন্য জটিলতার পর।
বিশ্ব উচ্চরক্তচাপ দিবসে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কার্ডিয়াক সোসাইটি, হাসপাতাল ও নানা বেসরকারি সংস্থা ফ্রি রক্তচাপ মাপার ক্যাম্প, জনসচেতনতা র্যালি, টকশো ও কমিউনিটি মিটিং আয়োজন করে। বার্তা থাকে—৩৫ বছরের ওপরে হলে অন্তত বছরে একবার, আর ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল বা পারিবারিক হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে আরও ঘন ঘন রক্তচাপ মাপা দরকার; খাবারে লবণ কমাতে হবে, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমাতে হবে, প্রতিদিন brisk walking বা অন্য ব্যায়াম করার চেষ্টা করতে হবে, ধূমপান ও তামাকজাত সব পণ্য ত্যাগ করতে হবে এবং মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করতে হবে।
দেশের বিভিন্ন প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও এনসিডি ক্লিনিকে নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, ওষুধ সরবরাহ ও ফলো-আপের ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশ্ব উচ্চরক্তচাপ দিবস এ উদ্যোগগুলোকে আরও দৃশ্যমান করে এবং মনে করিয়ে দেয় যে সহজ কিছু পদক্ষেপ ও নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষই স্বাভাবিক বা নিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ নিয়ে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন কী?
- উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে ধমনীর ভেতরে রক্তের চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকে, ফলে ধীরে ধীরে হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক, কিডনি ও রক্তনালিতে ক্ষতি হতে পারে।
- উচ্চ রক্তচাপে কি সব সময় লক্ষণ থাকে?
- না। অধিকাংশ মানুষেরই উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। তাই নিজেকে ভালো লাগলেও নিয়মিত রক্তচাপ মাপা খুব জরুরি।
- ওষুধ ছাড়া কীভাবে রক্তচাপ কমানো যেতে পারে?
- অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে রক্তচাপ কমানো সম্ভব—খাবারে লবণ কমানো, বেশি শাকসবজি ও ফল খাওয়া, ওজন কমানো বা নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা, ধূমপান ও অন্য তামাকজাত পণ্য ত্যাগ করা, অ্যালকোহল এড়ানো, মানসিক চাপ কমানো ও ভালো ঘুমানো। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এসবের সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শমতো নিয়মিত ওষুধও প্রয়োজন হয়।

