প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়। এ দিনটির উদ্দেশ্য হলো ভাইরাল হেপাটাইটিসকে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে সামনে আনা এবং প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। ২৮ জুলাই হল নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ডা. বারুচ ব্লুমবার্গের জন্মদিন, যিনি হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আবিষ্কার করেন এবং এর টিকা উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাই তার অবদানকে স্মরণ করেই এই তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
History
হেপাটাইটিস নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করা বিভিন্ন রোগী সংগঠন ও লিভার স্বাস্থ্য সংস্থা বহু বছর ধরে সচেতনতা দিবস পালন করছিল। ২০০৮ সালে ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্স নামের একটি আন্তর্জাতিক রোগী সংগঠন নেটওয়ার্ক প্রথমবারের মতো সমন্বিতভাবে বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস সচেতনতা দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়।
ভাইরাল হেপাটাইটিসের বিশাল স্বাস্থ্য-ঝুঁকি দেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এ প্রচেষ্টায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়। ২০১০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদ একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে, যাতে একটি নির্দিষ্ট বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালনের আহ্বান জানানো হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে WHO আনুষ্ঠানিকভাবে ২৮ জুলাইকে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
এর পর থেকে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস WHO-র আনুষ্ঠানিক বৈশ্বিক স্বাস্থ্য দিবসগুলোর একটি হিসেবে পালিত হচ্ছে। প্রতিবছর নির্দিষ্ট একটি মূলবক্তব্য বা থিম নির্ধারণ করা হয়, যার মাধ্যমে অজানা সংক্রমিত রোগী চিহ্নিত করা, টিকাদান বাড়ানো এবং সবার জন্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা সহজলভ্য করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
হেপাটাইটিস ভাইরাসের পাঁচটি প্রধান ধরন রয়েছে: A, B, C, D ও E। সবগুলোই যকৃতের সংক্রমণ ঘটায়, তবে সংক্রমণের পথ, রোগের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব একেকটির একেক রকম। সাধারণত হেপাটাইটিস A ও E দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি সংক্রমণ তৈরি করে। অন্যদিকে হেপাটাইটিস B, C ও D রক্ত ও শরীরের তরলের মাধ্যমে ছড়ায় এবং প্রায়ই দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণে পরিণত হয়ে ধীরে ধীরে যকৃত নষ্ট করে।
দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস B ও C সংক্রমণই বিশ্বের অধিকাংশ লিভার সিরোসিস ও প্রাথমিক লিভার ক্যান্সারের মূল কারণ। অনেক মানুষ বছরের পর বছর এসব ভাইরাস বহন করেও কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ অনুভব করেন না। যখন জন্ডিস, পেটে পানি জমা বা অন্যান্য উন্নত পর্যায়ের লক্ষণ দেখা দেয়, তখন যকৃতের ক্ষতি অনেক দূর গিয়ে যেতে পারে। তাই ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসার আওতায় আনা খুবই জরুরি।
সুখবর হলো, হেপাটাইটিস B সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ, কারণ এর জন্য নিরাপদ ও কার্যকর টিকা রয়েছে। অধিকাংশ দেশে এই টিকা শিশুকালের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির অংশ। হেপাটাইটিস A এর জন্যও প্রয়োজন অনুযায়ী টিকা দেওয়া যায়। আধুনিক অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের মাধ্যমে এখন অনেক ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস C সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব এবং হেপাটাইটিস B সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রেখে সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনা যায়। নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, ইনজেকশন ও অস্ত্রোপচারের সময় জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার, এবং ব্লেড বা সূচ কখনোই ভাগাভাগি না করা সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মূল তথ্য
তারিখের উৎস
- ২৮ জুলাই হল ডা. বারুচ ব্লুমবার্গের জন্মদিন
- যিনি হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আবিষ্কার করেন এবং এর টিকা উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেন।
পাঁচটি প্রধান ভাইরাস
- হেপাটাইটিস A
- B
- C
- D ও E হল সবচেয়ে পরিচিত ধরন
- প্রতিটির সংক্রমণের পথ ও রোগের ধরন ভিন্ন।
বিশ্বব্যাপী প্রভাব
- ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটায়
- যার বেশিরভাগই দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস B ও C এর কারণে সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার থেকে হয়।
প্রতিরোধ
- হেপাটাইটিস B টিকা একটি নিরাপদ ও কার্যকর উপায়
- যা শৈশবেই দেওয়া হয় এবং অনেক দেশে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির অংশ।
চিকিৎসা
- আধুনিক অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের মাধ্যমে অধিকাংশ হেপাটাইটিস C রোগীকে আরোগ্য করা যায় এবং হেপাটাইটিস B অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশে ভাইরাল হেপাটাইটিস, বিশেষ করে হেপাটাইটিস B ও E একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। হেপাটাইটিস B সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়, যদিও জাতীয় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) শিশুদের জন্য হেপাটাইটিস B টিকা অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নতুন প্রজন্ম অনেকটাই সুরক্ষিত হচ্ছে। নিয়মিত টিকাদানের ফলে ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস B রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে আশা করা হয়।
হেপাটাইটিস E বাংলাদেশে বারবার প্রাদুর্ভাব আকারে দেখা যায়, বিশেষ করে শহরের বস্তি এলাকা ও যেখানে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা দুর্বল। দূষিত পানীয় জলই এর প্রধান কারণ এবং বর্ষা ও বন্যার সময় এ ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। গর্ভবতী নারীরা হেপাটাইটিস E সংক্রমণে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকিতে থাকেন, যা এ রোগকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে।
হেপাটাইটিস C বাংলাদেশেও বিদ্যমান এবং এর সংক্রমণ অনেক সময় অসুরক্ষিত ইনজেকশন, ব্যবহৃত সূচ বা সিরিঞ্জ পুনঃব্যবহার, অপর্যাপ্তভাবে জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা বা ডেন্টাল যন্ত্রপাতি এবং কখনো কখনো অসুরক্ষিত রক্ত সঞ্চালনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সচেতনতা বাড়ার ফলে এখন অনেকেই হেপাটাইটিস C সম্পর্কে জানেন, তবে অনেক সংক্রমিত ব্যক্তি এখনো পরীক্ষা করাননি এবং জানেন না যে কার্যকর চিকিৎসা পাওয়া যায়।
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে হেপাটোলজিস্ট, চিকিৎসক সমিতি, হাসপাতাল, এনজিও ও রোগী সংগঠনগুলো সেমিনার, স্ক্রিনিং ক্যাম্প, টক শো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচার এবং শিক্ষামূলক কর্মসূচি আয়োজন করে। এসব কর্মসূচিতে হেপাটাইটিস B টিকা নেওয়ার গুরুত্ব, বিবাহ বা গর্ভধারণের আগে স্ক্রিনিং, অপ্রয়োজনীয় ইনজেকশন এড়ানো, সবসময় নতুন বা ঠিকমতো জীবাণুমুক্ত সিরিঞ্জ ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার, এবং জন্ডিসের ইতিহাস থাকলে বা পরিবারের কারও লিভার রোগ থাকলে দ্রুত পরীক্ষা করানোর বার্তা দেওয়া হয়।
পরিবারের জন্য মূল বার্তা হলো, আপনার যকৃতকে রক্ষা করা যায় সচেতনতার মাধ্যমে। টিকা, নিরাপদ চিকিৎসা ও দাঁতের সেবা, রক্ত ও সূচ ভাগাভাগি না করা, এবং ঝুঁকিতে থাকলে পরীক্ষা করানো আপনাকে ও আপনার পরিবারকে হেপাটাইটিসের মারাত্মক জটিলতা থেকে রক্ষা করতে পারে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- হেপাটাইটিসের কয়টি ধরন আছে?
- হেপাটাইটিস ভাইরাসের পাঁচটি প্রধান ধরন রয়েছে: A, B, C, D ও E। সবগুলোই যকৃতকে আক্রান্ত করে, তবে সংক্রমণের পথ, রোগের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব একেকটির একেক রকম।
- হেপাটাইটিস B কি প্রতিরোধযোগ্য?
- হ্যাঁ। হেপাটাইটিস B একটি নিরাপদ ও কার্যকর টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়। এই টিকা বাংলাদেশসহ অনেক দেশে শিশুকালের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির অংশ। ঝুঁকিতে থাকা প্রাপ্তবয়স্করাও উপযুক্ত পরীক্ষা ও পরামর্শ নিয়ে এ টিকা নিতে পারেন।
- ভাইরাল হেপাটাইটিস থেকে বাঁচতে আমি কী করতে পারি?
- আপনি কয়েকটি সহজ পদক্ষেপ নিয়ে ঝুঁকি অনেক কমাতে পারেন। যেমন হেপাটাইটিস B টিকা গ্রহণ করা, ইনজেকশন বা চিকিৎসার সময় সবসময় নতুন বা সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত সিরিঞ্জ ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার নিশ্চিত করা, ব্লেড বা সূচ কখনোই অন্য কারও সঙ্গে ভাগাভাগি না করা, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত করা, নিরাপদ খাবার ও বিশুদ্ধ পানি গ্রহণ করা এবং নিরাপদ যৌন আচরণ অনুসরণ করা।

