প্রতি বছর ৪ মার্চ বিশ্ব স্থূলতা দিবস পালিত হয়, যাতে স্থূলতাকে শুধু সৌন্দর্য বা ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণের বিষয় না ভেবে একটি গুরুতর, দীর্ঘমেয়াদি এবং চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে দেখা হয়। এ দিবসটি বিশ্ব স্থূলতা ফেডারেশন (World Obesity Federation) ও তার অংশীদার সংস্থাগুলোর উদ্যোগে হয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)সহ নানা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থা এটি সমর্থন করে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
স্থূলতা টাইপ ২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ফ্যাটি লিভার, কিছু ক্যান্সার, জয়েন্টের সমস্যা ও স্লিপ এপনিয়ার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে এটি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে—উদ্বেগ, আত্মমর্যাদা কমে যাওয়া ও বিষণ্নতা বাড়তে পারে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে, এমনকি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেও, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের চেয়ে বেশি। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, নগরায়ন, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনিযুক্ত পানীয়ের বিজ্ঞাপন ও সহজ প্রাপ্যতা, এবং ব্যায়ামের নিরাপদ জায়গার অভাব—সব মিলিয়ে স্থূলতা সমস্যাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্ব স্থূলতা দিবস মনে করিয়ে দেয় যে স্থূলতা প্রতিরোধ ও চিকিৎসা করা যায়, এবং স্থূলতায় ভোগা মানুষকে দোষারোপ নয়, সহানুভূতিশীল সহায়তা দেওয়া জরুরি।
History
বিশ্ব স্থূলতা ফেডারেশন ২০১০-এর দশকে বিশ্ব স্থূলতা দিবসের সূচনা করে, যাতে স্থূলতা ও সংশ্লিষ্ট অসংক্রামক রোগ (NCD) সম্পর্কে নীতি-নির্ধারক ও সাধারণ মানুষের মনোযোগ বাড়ে। শুরুতে তারিখ ভিন্ন হলেও পরে ৪ মার্চকে স্থির করা হয় এবং ২০২০ সাল থেকে নতুন করে বৈশ্বিক ক্যাম্পেইন হিসেবে চালু হয়, যার মূল বার্তা হলো স্থূলতার মূল কারণগুলো একসাথে মোকাবিলা করা। এ দিবসের কর্মসূচিতে থাকে—স্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিবেশ তৈরি, শিশুদের উদ্দেশ্যে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টিকর খাবারকে সাশ্রয়ী করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের স্থূলতা নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ওজন নিয়ে বিদ্বেষ ও উপহাস কমানো। স্থূলতাকে এখন এমন একটি জটিল অবস্থা হিসেবে দেখা হয়, যা জেনেটিক, পরিবেশগত ও সামাজিক বিভিন্ন কারণে প্রভাবিত হয়; তাই এর সমাধানও বহু-স্তরবিশিষ্ট হতে হবে।
Key facts
সংজ্ঞা
- সাধারণত বডি মাস ইনডেক্স (BMI) দিয়ে স্থূলতা নির্ণয় করা হয়; প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে BMI ৩০ বা তার বেশি হলে স্থূলতা ধরা হয়
- তবে এশীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে অনেক সময় ২৩–২৫ এর উপরে গেলেই ঝুঁকি বাড়তে শুরু করে।
প্রধান কারণ
- অতিরিক্ত ক্যালরি-সমৃদ্ধ জাঙ্ক ও প্রক্রিয়াজাত খাবার
- চিনিযুক্ত পানীয়
- শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি
- দীর্ঘ সময় বসে থাকা
- ঘুমের সমস্যা
- মানসিক চাপ ও কিছু ওষুধ বা রোগ।
স্বাস্থ্যগত প্রভাব
- টাইপ ২ ডায়াবেটিস
- উচ্চ রক্তচাপ
- হৃদরোগ
- স্ট্রোক
- ফ্যাটি লিভার
- কিডনি রোগ
- অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
শিশু ও কিশোর
- বিশ্বজুড়ে শিশুকালীন স্থূলতা দ্রুত বাড়ছে; সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে তাদের পুরো জীবনজুড়েই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে যায়।
কলঙ্ক ও বৈষম্য
- ওজন নিয়ে উপহাস বা বৈষম্য অনেককে চিকিৎসা থেকে দূরে রাখে; সফল ব্যবস্থাপনার জন্য সম্মানজনক ও সহানুভূতিশীল আচরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার কারণে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা ক্রমেই বাড়ছে—শুধু শহরেই নয়, এখন গ্রামেও। ভাজাপোড়া, ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত ভাত ও মিষ্টি জাতীয় খাবার, চিনিযুক্ত কোমল পানীয় এবং দীর্ঘ সময় অফিস, যানজট বা টিভি–মোবাইলের সামনে বসে থাকার অভ্যাস ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ফ্যাটি লিভার রোগকে বাড়িয়ে তুলছে। বিশ্ব স্থূলতা দিবসে বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা ব্যালান্সড ডায়েট, বাড়িতে রান্না করা শাকসবজি ও ফল খাওয়া, পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, এবং শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম কমানোর বার্তা ছড়ায়। স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা, পার্ক ও খেলার মাঠ নিরাপদ রাখা, অফিস বা কারখানায় স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ তৈরি এবং জাতীয় এনসিডি কর্মসূচিতে স্থূলতা প্রতিরোধকে অন্তর্ভুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ দিবস স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্থূলতায় ভোগা মানুষকে লজ্জা না দিয়ে, তাদের পুষ্টি পরামর্শ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার মাধ্যমে সহায়তা করা প্রয়োজন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- স্থূলতা কী?
- স্থূলতা এমন একটি স্বাস্থ্যঅবস্থা, যেখানে দেহে অতিরিক্ত চর্বি জমে গিয়ে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। সাধারণত বডি মাস ইনডেক্স (BMI), কোমরের মাপ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখে স্থূলতা নির্ণয় করা হয়।
- বাংলাদেশে কি স্থূলতা অনেক বেড়েছে?
- হ্যাঁ। বাংলাদেশে শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায়ই প্রাপ্তবয়স্ক ও স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা বাড়ছে, যার কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগও বেড়ে যাচ্ছে।
- স্থূলতা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়?
- স্থূলতা প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত শাকসবজি, ফল ও পূর্ণ শস্যসমৃদ্ধ সুষম খাবার খেতে হবে; ভাজাপোড়া, জাঙ্ক ফুড ও চিনিযুক্ত কোমল পানীয় কমাতে হবে; সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট হাঁটা বা অন্য শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে; পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে; এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ওজন, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

