প্রতি বছর ২০ অক্টোবর বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস পালিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য হলো অস্টিওপোরোসিস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং সারা জীবন হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা। অল্প আঘাত বা সামান্য পড়ে যাওয়ায় নিতম্ব, মেরুদণ্ড বা কব্জির হাড় ভেঙে যাওয়া অনেক সময় “বয়সের স্বাভাবিক ব্যাপার” মনে করা হয়, কিন্তু আসলে এটি প্রায়ই অস্টিওপোরোসিসের লক্ষণ – যা আগে থেকে প্রতিরোধ ও চিকিৎসা করা সম্ভব।
History
বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস প্রথম শুরু হয় ১৯৯৬ সালে, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল অস্টিওপোরোসিস সোসাইটির উদ্যোগে এবং ইউরোপিয়ান কমিশনের সহযোগিতায়। পরবর্তীতে ইন্টারন্যাশনাল অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশন (IOF) এ উদ্যোগের বৈশ্বিক নেতৃত্ব গ্রহণ করে এবং দিনটিকে একটি আন্তর্জাতিক সচেতনতা দিবসে রূপ দেয়। সেই থেকে প্রতি বছর ২০ অক্টোবর নানা দেশ, হাসপাতাল, চিকিৎসক সংগঠন ও রোগী সংগঠন মিলে এ দিবস পালন করে আসছে।
ধীরে ধীরে এ কর্মসূচি ৯০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশে খোলা আকাশের নিচে ফ্রি বোন হেলথ ক্যাম্প, জনসচেতনতামূলক সেমিনার, হাঁটা বা ব্যায়াম কর্মসূচি, গণমাধ্যম প্রচার ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি ও প্রতিরোধের উপায় তুলে ধরা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০ বছরের বেশি বয়সী প্রতি ৩ জন নারীর ১ জন এবং প্রতি ৫ জন পুরুষের ১ জন জীবনের কোনো এক সময়ে অস্টিওপোরোটিক ফ্র্যাকচারের শিকার হন।
অস্টিওপোরোসিসকে প্রায়ই “নীরব রোগ” বলা হয়। কারণ হাড়ের ভেতরের অংশ ধীরে ধীরে পাতলা ও ভঙ্গুর হয়ে গেলেও সাধারণত কোনো ব্যথা বা স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তাদের হাড় দুর্বল হয়ে গেছে, যতক্ষণ না হঠাৎ কোনো ছোট দুর্ঘটনায় – যেমন সামান্য পড়ে যাওয়া, বাঁকা হয়ে কিছু তোলা, কিংবা হালকা ধাক্কায় – কব্জি, নিতম্ব বা মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। বিশেষ করে নিতম্বের ফ্র্যাকচার বয়স্কদের জন্য গুরুতর; এতে দীর্ঘমেয়াদি বিছানায় পড়ে থাকা, চলাফেরার ক্ষমতা কমে যাওয়া, অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
আমাদের হাড় কেবল দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটার জন্য নয়, দৈনন্দিন সব কাজকর্মের ভিত্তি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবেই কিছুটা হাড়ের ঘনত্ব কমে, কিন্তু অস্টিওপোরোসিসে এই ক্ষয় অনেক বেশি হয় এবং হাড়ের ভেতরের কাঠামো ফাঁপা ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। ঝুঁকি বাড়ায় এমন কারণের মধ্যে রয়েছে – বয়স্ক হওয়া, মহিলা হওয়া (বিশেষ করে মেনোপজের পর), পরিবারে অল্প আঘাতে হাড় ভাঙার ইতিহাস, খুব কম ওজন, শারীরিক পরিশ্রম কম করা, কম ক্যালসিয়াম গ্রহণ, ভিটামিন ডি-এর অভাব, ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন, দীর্ঘদিন স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ খাওয়া এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগ (যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, থাইরয়েড বা কিডনির রোগ) ইত্যাদি।
কারণ অস্টিওপোরোসিস গোপনে অগ্রসর হয়, তাই আগে থেকে শনাক্ত করা খুব জরুরি। বোন মিনারেল ডেনসিটি (Bone Mineral Density) পরীক্ষা, যেমন DEXA স্ক্যান, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া ধরে ফেলতে পারে এবং ফ্র্যাকচার হওয়ার আগেই চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ দেয়। বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকা গোষ্ঠী – মেনোপজ-উত্তর নারী, ৫০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষ যাদের ঝুঁকির কারণ আছে, এবং যাদের আগে অল্প আঘাতে হাড় ভেঙেছে – তাদের হাড়ের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করে।
প্রতিরোধে যা দরকার তা মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায় – পুষ্টি, ব্যায়াম ও জীবনধারা। খাদ্যে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম (যেমন দুধ, দই, ছোট মাছের কাঁটা, শাকসবজি, কিছু ডাল ও ফোর্টিফাইড খাবার) এবং যথেষ্ট ভিটামিন ডি (রোদে থাকা, ডিমের কুসুম, কিছু মাছ ও প্রয়োজনে সাপ্লিমেন্ট) হাড়কে মজবুত রাখতে সাহায্য করে। ওজন বহনকারী ব্যায়াম ও পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম – যেমন হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা, হালকা রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং, ভারসাম্য রক্ষার অনুশীলন – হাড় ও পেশিকে সবল করে, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমায়। ধূমপান বন্ধ করা, অ্যালকোহল কমানো এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের ইতোমধ্যে অস্টিওপোরোসিস ধরা পড়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশেষ ওষুধ (যেমন বিসফসফোনেটসহ অন্যান্য বোন-স্ট্রেনদেনিং ড্রাগ) ব্যবহার করলে ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। একই সঙ্গে বাড়িতে পড়ে যাওয়া প্রতিরোধে সতর্কতা – যেমন মেঝেতে পিচ্ছিল কার্পেট না রাখা, পর্যাপ্ত আলো রাখা, সিঁড়ি ও বাথরুমে রেলিং লাগানো, ভালো গ্রিপ রয়েছে এমন জুতা পরা এবং চোখের দৃষ্টি যাচাই করা – বয়স্কদের নিরাপত্তা বাড়ায়।
মূল তথ্য
বৈশ্বিক নেতৃত্ব
- ১৯৯৬ সাল থেকে ইন্টারন্যাশনাল অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশন (IOF) বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবসের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
খুব সাধারণ কিন্তু অবহেলিত
- ৫০ বছরের বেশি বয়সী প্রতি ৩ জন নারীর ১ জন এবং প্রতি ৫ জন পুরুষের ১ জন জীবদ্দশায় অস্টিওপোরোটিক ফ্র্যাকচারের শিকার হন বলে ধারণা করা হয়।
নীরব রোগ
- বেশিরভাগ সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই হাড়ের ক্ষয় হয়; অনেকের ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষণই হলো সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়া।
প্রতিরোধ সম্ভব
- পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি
- নিয়মিত ওজন বহনকারী ব্যায়াম এবং ধূমপান-অ্যালকোহল পরিহারসহ স্বাস্থ্যকর জীবনধারার মাধ্যমে হাড়ের ঘনত্ব রক্ষা ও ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো যায়।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশে অস্টিওপোরোসিস তুলনামূলক নতুন আলোচ্য বিষয় হলেও বয়স্কদের মধ্যে হাড় ভাঙার ঘটনা মোটেও বিরল নয়। অনেক সময় কোমর বা পিঠের ব্যথা, কুঁজো হয়ে যাওয়া বা উচ্চতা কমে যাওয়াকে “বয়সের ব্যথা” ধরে নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। রাজধানী ও বড় শহরের বাইরে বোন ডেনসিটি (DEXA) পরীক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় সঠিক নির্ণয় বিলম্বিত হতে পারে।
অনেক অঞ্চলে খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়ামের অভাব থাকতে পারে – যেমন দুধ বা দুধজাত খাবার নিয়মিত না খাওয়া, ছোট মাছের কাঁটা না খাওয়া ইত্যাদি। একই সঙ্গে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিও দেখা যায়, যদিও বাংলাদেশে প্রচুর রোদ আছে। দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরে থাকা, বিশেষ করে নারীদের কম বাইরে যাওয়া, সম্পূর্ণ ঢেকে রাখা পোশাক এবং গাঢ় বর্ণের ত্বক – এ সব মিলিয়ে ত্বকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরি হতে বাধা পেতে পারে। বহু গর্ভধারিণী বা অপুষ্টিতে ভোগা নারীদের পরবর্তী জীবনে হাড়ের দুর্বলতা বেশি দেখা যেতে পারে।
বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হাড়ের স্বাস্থ্যকে সামনে আনার একটি সুযোগ। অর্থোপেডিক্স, রিউমাটোলজি, এন্ডোক্রিনোলজি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি পরিবার-পর্যায়েও এ বিষয়ে কথা বলা দরকার। হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো সেমিনার, জনসচেতনতা সভা, মিডিয়া টকশো ও স্বাস্থ্যবিষয়ক নিবন্ধের মাধ্যমে অস্টিওপোরোসিস ও হাড় ভাঙা প্রতিরোধের বার্তা ছড়াতে পারে। বয়স্ক যারা ইতোমধ্যেই অল্প আঘাতে নিতম্ব, কব্জি বা মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙেছেন, তাদের পুনরায় ফ্র্যাকচার প্রতিরোধে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।
পারিবারিক পর্যায়ে করণীয়ের মধ্যে রয়েছে – পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের জন্য যতটা সম্ভব ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখা, নিরাপদ সময়ে সামান্য হলেও রোদে বসতে উৎসাহিত করা, হাঁটার মতো সহজ ব্যায়ামে সহায়তা করা, বাড়ির ভেতর অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে ফেলা যাতে হোঁচট খাওয়ার ঝুঁকি কমে, বাথরুমে স্লিপ-প্রুফ ব্যবস্থা রাখা এবং সিঁড়িতে বা উঁচু-নিচু জায়গায় হাতল ব্যবহার করা। ৪০ বা ৫০-এর কোঠায় যারা, বিশেষ করে মেনোপজের কাছাকাছি বা পরের নারী এবং যারা দীর্ঘদিন স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ নিচ্ছেন, ধূমপান করেন বা খুব কম ওজনের – তাদের জন্য এখন থেকেই হাড়ের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এভাবে বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবসকে কেন্দ্র করে সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ বাড়াতে পারলে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে প্রতিরোধযোগ্য অস্টিওপোরোটিক ফ্র্যাকচারের সংখ্যা কমানো সম্ভব। হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষা মানে বয়স্কদের চলাফেরা, স্বনির্ভরতা ও জীবনের মান রক্ষা – যা পুরো পরিবার ও সমাজের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- অস্টিওপোরোসিসকে নীরব রোগ বলা হয় কেন?
- অস্টিওপোরোসিসকে নীরব রোগ বলা হয় কারণ হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া বা হাড় ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া সাধারণত ধীরে ধীরে ও ব্যথাহীনভাবে ঘটে। অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তাদের হাড় দুর্বল হয়ে গেছে, যতক্ষণ না সামান্য পড়ে যাওয়া, ধাক্কা লাগা বা কিছু তুলতে গিয়ে কব্জি, নিতম্ব বা মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়।
- হাড়ের স্বাস্থ্য কীভাবে রক্ষা করবো?
- হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য খাদ্যে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি রাখা, নিয়মিত ওজন বহনকারী ও পেশি শক্তিশালীকারী ব্যায়াম করা (যেমন হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা, হালকা রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং), ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং ঝুঁকির কারণ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনে হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা ও ওষুধ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
- কারা অস্টিওপোরোসিস ও ফ্র্যাকচারের বেশি ঝুঁকিতে?
- মেনোপজ-উত্তর নারী, ৬৫ বছরের বেশি বয়স্ক নারী-পুরুষ, যাদের পরিবারে অল্প আঘাতে হাড় ভাঙার ইতিহাস আছে, খুব কম ওজনের মানুষ, যারা খুব কম শারীরিক পরিশ্রম করেন, ধূমপায়ী ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনকারী, যারা দীর্ঘ সময় ধরে স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ খাচ্ছেন এবং যাদের রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, থাইরয়েডের সমস্যা বা কিডনির দীর্ঘস্থায়ী রোগের মতো অসুস্থতা আছে – এরা অস্টিওপোরোসিস ও ফ্র্যাকচারের বেশি ঝুঁকিতে।

