প্রতি বছর ১৭ নভেম্বর বিশ্ব অকালজাত শিশু দিবস পালিত হয়। এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের (অকাল বা প্রিটার্ম নবজাতক) ঝুঁকি, জটিলতা ও পরিবারে এর মানসিক-সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং বিশ্বব্যাপী এসব শিশুর জন্য উন্নত ও সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো করা।
History
বিশ্ব অকালজাত শিশু দিবসের সূচনা হয় মূলত কিছু ইউরোপীয় এবং আফ্রিকান পিতামাতার সংগঠনের উদ্যোগে, যারা নিজেরাই অকালজাত শিশুর পিতা-মাতা হিসেবে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। ২০১১ সালে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বৈশ্বিক সচেতনতা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং পরবর্তীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ, নবজাতক বিশেষজ্ঞ সংগঠন ও প্যারেন্ট সাপোর্ট গ্রুপগুলো এতে যোগ দেয়। বেগুনি রঙ, ছোট জুতো বা ক্ষুদ্র পদচিহ্নের প্রতীক প্রায়ই অকালজাত শিশুকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়।
প্রতি বছর বিশ্ব অকালজাত শিশু দিবসে ভিন্ন ভিন্ন থিম নির্ধারণ করা হয় – যেমন “প্রত্যেক শিশুর সমান যত্নের অধিকার”, “নবজাতকের যত্নে মায়ের অংশগ্রহণ” বা “মা ও শিশুর জন্য শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা”। সারা বিশ্বের হাসপাতাল, নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট (NICU), কমিউনিটি সংগঠন ও পরিবারগুলো আলোচনাসভা, অভিজ্ঞতা বিনিময়, স্মরণ অনুষ্ঠান, প্যারেন্ট সাপোর্ট মিটিং, শিক্ষামূলক সেশন এবং নানা প্রচারাভিযানের মাধ্যমে দিবসটি পালন করে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
অকাল জন্ম বিশ্বব্যাপী ৫ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। ধারণা করা হয়, বিশ্বে প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে প্রায় ১টি ৩৭ সপ্তাহের আগে অকাল জন্মগ্রহণ করে। এ ধরনের নবজাতকরা জন্মের পরই শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস অপূর্ণতা, তাপমাত্রা ধরে রাখতে না পারা, সংক্রমণ, খাওয়ার সমস্যা, মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির সমস্যা এবং পরবর্তী জীবনে শেখার অসুবিধা বা বিকাশ বিলম্বের ঝুঁকিতে থাকে।
তবু অনেক ক্ষেত্রেই অল্প খরচে, সহজ কিছু পদক্ষেপ অকালজাত ও কম ওজনের শিশুদের জীবন বাঁচাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে প্রসবের আগে ঝুঁকিপূর্ণ মায়েদের স্টেরয়েড ইনজেকশন দিয়ে শিশুর ফুসফুস পরিপক্ব করার ব্যবস্থা করা, পরিষ্কার ও নিরাপদ প্রসব সেবা নিশ্চিত করা, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও দ্রুত চিকিৎসা, শিশুকে সব সময় উষ্ণ রাখা এবং মায়ের দুধ খাওয়ানো। ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (KMC) – অর্থাৎ মা বা পিতামাতার বুকে নবজাতককে ত্বকে-ত্বকে জড়িয়ে রাখা এবং সম্ভব হলে সব সময় মায়ের দুধ খাওয়ানোর এই পদ্ধতি প্রমাণিতভাবে অকালজাত শিশুদের মৃত্যু, সংক্রমণ ও হাইপোথার্মিয়া (শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া) কমায়, বিশেষ করে সীমিত সম্পদপূর্ণ দেশে।
একই সঙ্গে অকাল জন্ম প্রতিরোধের দিকেও বিশ্ব অকালজাত শিশু দিবসে জোর দেওয়া হয়। গর্ভাবস্থায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা (অ্যান্টেনাটাল কেয়ার), উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, মায়ের পুষ্টি ও রক্তস্বল্পতা দূর করা, গর্ভধারণের মাঝে যথেষ্ট বিরতি রাখা, ধূমপান ও মাদক থেকে দূরে থাকা এবং প্রয়োজনে দ্রুত প্রসূতি সেবাকেন্দ্রে রেফার করা – এসব বিষয় অকাল জন্মের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মূল তথ্য
শুরুর বছর
- ২০১১ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী বিশ্ব অকালজাত শিশু দিবস পালিত হয়ে আসছে।
কতটা সাধারণ
- বিশ্বে আনুমানিক প্রতি ১০টি শিশুর ১টি গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই (প্রিটার্ম) জন্ম নেয়।
প্রধান প্রভাব
- অকাল জন্ম ও এর জটিলতা ৫ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর একটি।
অসাম্য
- বাংলাদেশসহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে অকাল জন্মের হার বেশি; অনেক জায়গায় এখনও এনআইসিইউ
- প্রশিক্ষিত কর্মী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশ বিশ্বের উচ্চ অকাল জন্মের হারযুক্ত দেশগুলোর অন্যতম, এবং নবজাতক ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর বড় একটি অংশই অকাল জন্মের জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। মায়ের অপুষ্টি ও রক্তস্বল্পতা, গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ, উচ্চ রক্তচাপ, খুব অল্প বয়সে বা ঘন ঘন গর্ভধারণ, সময়মতো অ্যান্টেনাটাল কেয়ার না পাওয়া এবং সুনির্দিষ্ট প্রসব সেবাকেন্দ্রে পৌঁছাতে বিলম্ব – এসব কারণে অনেক শিশুর জন্মই হয় সময়ের আগে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ অকাল ও কম ওজনের নবজাতকের যত্নে কিছু গুরুত্বপূর্ণ, কম খরচের হস্তক্ষেপ বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো হাসপাতাল ও কমিউনিটি পর্যায়ে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (KMC) প্রচলন। এখানে মা (বা অন্য কেয়ারগিভার) শিশুটিকে বুকের সাথে ত্বকে-ত্বকে উলম্বভাবে ধরে রাখেন, উপরে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখেন এবং যতটা সম্ভব এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং চালিয়ে যান। এই ত্বকে-ত্বকে স্পর্শ শিশুর শরীর গরম রাখে, শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন স্থিতিশীল করে, ওজন বাড়তে সাহায্য করে, মা-শিশুর বন্ধন মজবুত করে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়।
বিশ্ব অকালজাত শিশু দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে নবজাতক বিশেষজ্ঞ (নিওনাটোলজিস্ট), শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ, ধাত্রী ও নার্সরা বিভিন্ন মাতৃসদন ও হাসপাতালের এনআইসিইউতে সচেতনতা কর্মসূচি, প্যারেন্ট কাউন্সেলিং সেশন, KMC প্রদর্শনী, মায়ের দুধ খাওয়ানোর ওপর প্রশিক্ষণ এবং নবজাতকের বিপদ সংকেত সম্পর্কে শিক্ষা কার্যক্রম আয়োজন করেন।
স্বাস্থ্যখাতের নীতিনির্ধারক ও অংশীদাররা এ দিনটিকে ব্যবহার করেন মা ও নবজাতকের মানসম্মত সেবা জোরদার করার বার্তা দিতে – যেমন গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত অ্যান্টেনাটাল ভিজিটে আনা, উচ্চ ঝুঁকির গর্ভধারণ দ্রুত চিহ্নিত ও রেফার করা, প্রশিক্ষিত কর্মীর উপস্থিতিতে নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা এবং অকালজাত শিশুর জন্য প্রয়োজন হলে অক্সিজেন, ইনকিউবেটর, ফিডিং সাপোর্টসহ নিবিড় পরিচর্যার সুযোগ তৈরি করা।
প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ, সময়মতো প্রসবকালীন সেবা, ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার এবং উন্নত নবজাতক নিবিড় পরিচর্যার সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে অকালজাত শিশুদের মৃত্যু ও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিশ্ব অকালজাত শিশু দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় – যত ছোটই হোক, প্রতিটি শিশুর বেঁচে থাকা ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার সমান এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে মা, পরিবার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার যৌথ সহযোগিতা অপরিহার্য।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- অকাল জন্ম কাকে বলে?
- গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে যে শিশুর জন্ম হয়, তাকে অকাল বা প্রিটার্ম জন্ম বলা হয়। যত আগে জন্ম হয়, শিশুর ফুসফুস, মস্তিষ্ক ও অন্যান্য অঙ্গ তত কম পরিপক্ব থাকে এবং শ্বাসকষ্ট, সংক্রমণ ও বিকাশজনিত জটিলতার ঝুঁকি তত বেশি হয়।
- ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার কী?
- ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (KMC) হলো একটি কম খরচের, প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি যেখানে অকাল বা কম ওজনের শিশুকে মায়ের (বা অন্য কেয়ারগিভারের) বুকে ত্বকে-ত্বকে লাগিয়ে উলম্বভাবে ধরে রাখা হয় এবং যতটা সম্ভব মায়ের দুধ খাওয়ানো হয়। এতে শিশুর শরীর গরম থাকে, শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন স্থিতিশীল হয়, ওজন ভালো বাড়ে, মা-শিশুর বন্ধন মজবুত হয় এবং মৃত্যুঝুঁকি কমে।
- অকালজাত শিশুর ঝুঁকি বেশি কেন?
- অকালজাত শিশুর জন্মের সময় তার ফুসফুস, মস্তিষ্ক, অন্ত্র ও রোগপ্রতিরোধক ব্যবস্থা পুরোপুরি পরিপক্ব থাকে না। ফলে তারা শ্বাস নিতে কষ্ট পেতে পারে, সহজে ঠান্ডা লেগে শরীরের তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে, সংক্রমণে দ্রুত আক্রান্ত হতে পারে এবং দুধ খাওয়া ও ওজন বাড়তে সমস্যা হতে পারে। পরবর্তী জীবনে কিছু শিশুর শেখার সমস্যা বা বিকাশে বিলম্বও দেখা যেতে পারে। তাই এ ধরনের নবজাতকের জন্য বাড়তি যত্ন ও পর্যবেক্ষণ জরুরি।

