প্রতি বছর ১৯ জুন বিশ্ব সিকল সেল দিবস পালিত হয়। এর উদ্দেশ্য হলো সিকল সেল রোগ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করা, যা একটি বংশগত রক্তের রোগ এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করে। এ দিনে রোগের বংশগত কারণ, লক্ষণ, জটিলতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ, স্বাস্থ্যকর্মী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়।
History
২০০৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯ জুন তারিখটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব সিকল সেল দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত উপমহাদেশসহ যেখানে এ রোগ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়, সেসব দেশের উদ্যোগ ও রোগী সংগঠনের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফল ছিল এ সিদ্ধান্ত। ২০০৯ সাল থেকে দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে।
সিকল সেল রোগ প্রথম ২০শ শতকের শুরুতে বৈজ্ঞানিকভাবে বর্ণিত হয়। পরে জানা যায়, হিমোগ্লোবিন তৈরির জিনে একটি নির্দিষ্ট পরিবর্তন (মিউটেশন) থেকেই এ রোগের উৎপত্তি। এ পরিবর্তনের ফলে অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন (HbS) তৈরি হয় এবং অক্সিজেনের ঘাটতি বা অন্য চাপের সময় লোহিত রক্তকণিকা শক্ত ও অর্ধচন্দ্রাকৃতির (সিকল আকৃতি) হয়ে যায়। এ ধরনের কণিকা ক্ষুদ্র রক্তনালিতে আটকে গিয়ে রক্ত প্রবাহ কমিয়ে দেয়, ফলে তীব্র ব্যথা ও বিভিন্ন অঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
সিকল সেল একটি বংশগত রোগ। সন্তান তখনই সিকল সেল রোগে আক্রান্ত হয়, যখন সে উভয় বাবা-মায়ের কাছ থেকে একটি করে সিকল জিন পায়। যদি শুধু এক জন অভিভাবকের কাছ থেকে সিকল জিন আসে, তাহলে সন্তান "ক্যারিয়ার" বা বাহক হয়—সাধারণত নিজের তেমন সমস্যা হয় না, কিন্তু ভবিষ্যতে সন্তানের মধ্যে এ জিন চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই যেসব পরিবার বা সম্প্রদায়ে এ রোগ বা ক্যারিয়ার বেশি, সেখানে বিবাহপূর্ব বা পারিবারিক পরামর্শ খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সিকল সেল রোগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তীব্র ব্যথার আক্রমণ বা "পেইন ক্রাইসিস"—হঠাৎ করে হাত-পা, হাড়, বুক বা পেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হতে পারে। এ ছাড়া রোগীরা প্রায়ই দীর্ঘস্থায়ী রক্তস্বল্পতায় ভোগে, ফলে সহজে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ইত্যাদি দেখা যায়। বারবার রক্তনালিতে বাধা ও অঙ্গের ক্ষতির কারণে স্ট্রোক, ফুসফুসের জটিলতা (acute chest syndrome), কিডনি সমস্যা, চোখের সমস্যা ও শিশুদের বেড়ে ওঠা ধীরগতির মতো জটিলতাও হতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ সিকল সেল রোগে প্লীহা (spleen) নামক অঙ্গটি শৈশবেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা দেহকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে রক্ষা করে। ফলে নিউমোনিয়া বা সেপসিসের মতো গুরুতর সংক্রমণে তারা দ্রুত মারাত্মক অবস্থায় চলে যেতে পারে। নবজাতক অবস্থায় স্ক্রিনিং করে রোগ শনাক্ত করা গেলে, সময়মতো অ্যান্টিবায়োটিক সুরক্ষা, টিকা এবং বাবা-মাকে শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে এ ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
মূল তথ্য
জাতিসংঘের স্বীকৃতি
- ২০০৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯ জুনকে বিশ্ব সিকল সেল দিবস হিসেবে ঘোষণা করে; ২০০৯ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যাপন শুরু হয়।
বংশগত ধরণ
- সন্তান তখনই সিকল সেল রোগে আক্রান্ত হয়
- যখন সে উভয় বাবা-মায়ের কাছ থেকে সিকল জিন পায়; শুধু এক জনের কাছ থেকে জিন পেলে সে ক্যারিয়ার হলেও সাধারণত রোগে আক্রান্ত হয় না।
রক্তকণিকার ওপর প্রভাব
- লোহিত রক্তকণিকা শক্ত ও অর্ধচন্দ্রাকার হয়ে ক্ষুদ্র রক্তনালি আটকে দেয়
- ফলে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায় ও তীব্র ব্যথা ও অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে।
সাধারণ লক্ষণ
- হাড় ও জোড়ায় তীব্র ব্যথার পর্ব
- রক্তস্বল্পতা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি
- চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)
- বারবার সংক্রমণ
- শিশুদের হাত-পা ফুলে যাওয়া এবং বেড়ে ওঠা ধীর হওয়া।
প্রতিরোধ ও যত্ন
- নবজাতক স্ক্রিনিং
- সময়মতো টিকা
- প্রয়োজনে দৈনিক অ্যান্টিবায়োটিক
- পর্যাপ্ত পানি পান
- সূর্য ও ঠান্ডা থেকে সুরক্ষা
- নিয়মিত হেমাটোলজিস্টের ফলো‑আপ
- ব্যথা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা এবং নির্বাচিত ক্ষেত্রে হাইড্রোক্সিউরিয়া বা বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের মতো চিকিৎসা পদ্ধতি জীবন ও আয়ু দুটিই বাড়াতে সাহায্য করে।
বিশ্বব্যাপী সচেতনতা
বিশ্ব সিকল সেল দিবসের মাধ্যমে দেশগুলোকে আহ্বান জানানো হয় যেন তারা জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিতে সিকল সেল রোগকে অগ্রাধিকার দেয়, নবজাতক স্ক্রিনিং চালু বা সম্প্রসারণ করে, রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা শক্তিশালী করে এবং রোগী ও পরিবারের জন্য সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে যেন এ রোগ নিয়ে কুসংস্কার ও বৈষম্য না থাকে, সে বিষয়েও সচেতনতা বাড়ানো হয়।
এ দিন রোগী সংগঠন, হাসপাতাল ও স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপগুলো সেমিনার, ক্যাম্পেইন, আলোচনাসভা ও গণমাধ্যমে প্রচারের আয়োজন করে। রোগী ও অভিভাবকের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে মানুষ জানতে পারে যে সিকল সেল কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়; এটি জিনগত কারণে হয় এবং নিয়মিত চিকিৎসা ও সহায়তা পেলে অনেকে স্বাভাবিকের কাছাকাছি জীবন যাপন করতে পারেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- সিকল সেল রোগ কীভাবে বংশগতভাবে আসে?
- সিকল সেল রোগ একটি বংশগত (অটোজোমাল রিসেসিভ) রোগ। সন্তান তখনই এ রোগে আক্রান্ত হয়, যখন সে উভয় বাবা-মায়ের কাছ থেকে একটি করে সিকল জিন পায়। যদি কেবল এক জন অভিভাবকের কাছ থেকে সিকল জিন আসে, তবে সন্তান ক্যারিয়ার বা বাহক হয়—সাধারণত তেমন লক্ষণ থাকে না, কিন্তু ভবিষ্যতে নিজের সন্তানের মধ্যে এ জিন চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- সিকল সেল রোগের প্রধান লক্ষণগুলো কী কী?
- সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে হাড়, জোড়া, বুক বা পেটে তীব্র ব্যথার পর্ব (পেইন ক্রাইসিস), দীর্ঘস্থায়ী রক্তস্বল্পতা ও ক্লান্তি, চোখ হলুদ হওয়া (জন্ডিস), বারবার সংক্রমণ, শিশুদের হাত-পা ফুলে যাওয়া ও বেড়ে ওঠা ধীর হওয়া, এবং কিছু ক্ষেত্রে স্ট্রোক বা শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা।

