মূল কন্টেন্টে যান

আমরা নিয়মিত তথ্য যোগ ও যাচাই করছি। কোনো তথ্য অনুপস্থিত বা ভুল মনে হলে আমাদের জানান, আমাদের টিম কাজ করছে। জানান

MedIndex
World Sight Day illustration showing an eye chart, an eye doctor examining a patient, children receiving glasses and an elderly person walking confidently after cataract surgery

স্বাস্থ্য দিবস2nd Thursday of October

বিশ্ব দৃষ্টি দিবস

প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্ব দৃষ্টি দিবস পালিত হয়। এ দিনের মূল উদ্দেশ্য হলো অন্ধত্ব ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং সবাইকে জানানো যে দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের একটি বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য বা চিকিৎসাযোগ্য। সহজ চোখ পরীক্ষা, সঠিক পাওয়ারের চশমা, সময়মতো ছানি অপারেশন এবং ডায়াবেটিক চোখের রোগসহ অন্যান্য সমস্যার চিকিৎসার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের দৃষ্টি রক্ষা করা সম্ভব।

History

বিশ্ব দৃষ্টি দিবস-এর সূচনা হয় WHO এবং ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর দ্য প্রিভেনশন অফ ব্লাইন্ডনেস (IAPB) পরিচালিত "VISION 2020: The Right to Sight" কর্মসূচির অংশ হিসেবে। ১৯৯৯ সালে চালু হওয়া এ উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা – বিশেষ করে ছানি, ট্র্যাকোমা, রিভার ব্লাইন্ডনেস, শিশুদের অন্ধত্ব ও রেফ্র্যাকটিভ এরর (চশমা লাগা চোখের সমস্যা) নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। বিশ্ব দৃষ্টি দিবস ধীরে ধীরে এ উদ্যোগের প্রধান বার্ষিক সচেতনতা দিবসে রূপ নেয়।

বর্তমানে IAPB-এর বিশ্বব্যাপী সমন্বয়ে প্রতি বছর বিভিন্ন দেশ, চক্ষু হাসপাতাল, পেশাজীবী সংগঠন, এনজিও ও সরকারি দপ্তর সম্মিলিতভাবে এ দিবস পালন করে। প্রতি বছর আলাদা থিমের মাধ্যমে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় – যেমন "Everyone counts", "Love your eyes", "Universal eye health" ইত্যাদি। সারা বিশ্বে এ দিনকে ঘিরে ফ্রি চোখ পরীক্ষা ক্যাম্প, ছানি অপারেশন ক্যাম্প, স্কুল ভিশন স্ক্রিনিং, র‍্যালি, আলোচনা সভা ও গণমাধ্যম প্রচার অনুষ্ঠিত হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০০ কোটির বেশি মানুষের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা এমন ধরনের, যা প্রতিরোধ করা যেত বা এখনো চিকিৎসা সম্ভব। অনেকেরই সমস্যা কেবলমাত্র নিকটদৃষ্টি বা দূরদৃষ্টি – অর্থাৎ সঠিক পাওয়ারের চশমা পেলেই দৃষ্টিশক্তি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে যায়। অন্যদের ক্ষেত্রে ছানি, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, গ্লুকোমা, কর্নিয়ার রোগ, ভিটামিন এ-এর অভাব বা চোখের আঘাতের মতো কারণ থাকে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ

চোখের দৃষ্টি ভালো থাকা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দৈনন্দিন কাজকর্ম, নিরাপদ চলাফেরা ও স্বনির্ভর জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। দৃষ্টিশক্তি কমে গেলে শিশুরা স্কুলের পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়তে পারে, প্রাপ্তবয়স্করা কাজ হারাতে পারেন বা আয় কমে যেতে পারে, বয়স্করা একা চলাফেরা ও নিজের কাজ করা থেকে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ফলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাও বটে।

এর বড় অংশই আসলে এড়ানো সম্ভব। একটি সহজ ও কম খরচের ছানি অপারেশনের মাধ্যমে বহু বয়স্ক মানুষের দৃষ্টি পুরোপুরি বা অনেকটাই ফেরানো যায়। সাধারণ চশমা নিকটদৃষ্টি, দূরদৃষ্টি বা প্রেসবায়োপিয়া (বয়সজনিত পড়ার কষ্ট) ঠিক করে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, সময়মতো চোখ পরীক্ষা করা এবং ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি বা গ্লুকোমার মতো রোগের চিহ্ন পাওয়া মাত্র চিকিৎসা শুরু করলে অন্ধত্ব ঠেকানো যায়। চোখকে ধুলাবালি, আঘাত ও অতিরিক্ত সূর্যালোক থেকে সুরক্ষা দেওয়াও জরুরি।

বিশ্ব দৃষ্টি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে চোখের সেবা কোনো বিলাসিতা নয়, মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকার। শিশু, বয়স্ক, ডায়াবেটিস রোগী, উচ্চ রক্তচাপ রোগী – সবারই নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা দরকার। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় চোখের চিকিৎসা যুক্ত করা, আরও বেশি চক্ষু চিকিৎসক, অপ্টোমেট্রিস্ট ও ভিশন টেকনিশিয়ান তৈরি করা এবং নারী, গ্রামীণ দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মূল তথ্য

বিশ্বব্যাপী সমন্বয়

  • ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর দ্য প্রিভেনশন অফ ব্লাইন্ডনেস (IAPB) বিশ্ব দৃষ্টি দিবসের সমন্বয় করে; WHO ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এ উদ্যোগে অংশ নেয়।

১০০ কোটি মানুষের সমস্যা

  • বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ১০০ কোটিরও বেশি মানুষের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা এমন
  • যা সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে প্রতিরোধ করা যেত বা এখনো চিকিৎসা সম্ভব।

অন্ধত্বের প্রধান কারণ

  • ছানি এখনো বিশ্বব্যাপী অন্ধত্বের প্রধান কারণ
  • অথচ এটি তুলনামূলক সহজ ও কম খরচের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসাযোগ্য।

জীবনের সব পর্যায়ে প্রভাব

  • শিশুদের পড়াশোনা
  • কর্মক্ষম বয়সে চাকরি ও আয়
  • এবং বয়স্কদের নিরাপদ চলাফেরা ও স্বনির্ভরতা – জীবনের প্রতিটি ধাপেই চোখের সুস্থতা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে

বাংলাদেশে অন্ধত্বের প্রধান কারণ ছানি। অনেক গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ বছরের পর বছর ঝাপসা দৃষ্টিতে বেঁচে থাকেন, কারণ তারা হয় অপারেশনের খরচ বহন করতে পারেন না, নয়তো জানেনই না যে একটি ছোট্ট অপারেশনের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টি ফেরানো সম্ভব। অনেক শিশু ও কিশোর-কিশোরী ব্ল্যাকবোর্ড বা বই পরিষ্কার দেখতে না পেয়ে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে – অথচ তাদের কেবল সঠিক পাওয়ারের চশমা লাগতে পারে।

সরকারি পর্যায়ে জাতীয় চক্ষু সেবা কর্মসূচির আওতায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালগুলোতে চক্ষু ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছে। ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত চোখের হাসপাতাল ও এনজিও সারা দেশে আউটরিচ ক্যাম্পের মাধ্যমে ফ্রি বা স্বল্পমূল্যে চোখ পরীক্ষা, চশমা বিতরণ ও ছানি অপারেশন করে থাকে। অনেক জেলায় নির্দিষ্ট সময়ে "আই ক্যাম্প" বসে, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে চোখ পরীক্ষা করান।

স্কুল ভিশন স্ক্রিনিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থীর চশমা লাগা চোখের সমস্যা শনাক্ত করা হচ্ছে। বিশ্ব দৃষ্টি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে র‍্যালি, সচেতনতা সভা, গণমাধ্যম টকশো, ফ্রি চক্ষু ক্যাম্প ও সোশ্যাল মিডিয়া প্রচার চালানো হয়। বার্তাগুলো সাধারণত – “ছানি অন্ধত্বের শেষ কথা নয়, অপারেশনে ভালো হওয়া যায়”, “চশমা পরা লজ্জার নয়, প্রয়োজনীয়”, এবং “হঠাৎ চোখে ব্যথা, লাল হওয়া বা আলো ফ্ল্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যান।”

ব্যক্তিগত ও পরিবারিক পর্যায়ে করণীয়ের মধ্যে রয়েছে – নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা, বিশেষ করে ৪০ বছরের পর; ডায়াবেটিস থাকলে বছরে অন্তত একবার চোখের পেছনের অংশ (রেটিনা) পরীক্ষা করানো; শিশু যদি বারবার চোখ কুঁচকে দেখে, খুব কাছে গিয়ে টিভি দেখে বা বই ধরে, মাথাব্যথা হয় – তাহলে দ্রুত চোখ পরীক্ষা করানো; স্থানীয় ওঝা বা ফার্মেসি থেকে অযথা স্টেরয়েড ড্রপ ব্যবহার না করা; এবং প্রয়োজন হলে ছানি অপারেশনের জন্য বয়স্ক আত্মীয়কে সহযোগিতা করা। এই সহজ পদক্ষেপগুলো মেনে চললে বাংলাদেশে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বিশ্ব দৃষ্টি দিবস কবে পালিত হয়?
প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্ব দৃষ্টি দিবস পালিত হয়। তারিখটি প্রতি বছর বদলালেও মূল বার্তা একই থাকে – অন্ধত্ব ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং নিয়মিত চোখ পরীক্ষা ও সময়মতো চিকিৎসাকে উৎসাহিত করা।
বিশ্বব্যাপী অন্ধত্বের প্রধান কারণ কী?
বিশ্বব্যাপী অন্ধত্বের প্রধান কারণ হলো ছানি – যা মূলত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের ভেতরের স্বচ্ছ লেন্স ঘোলাটে হয়ে যাওয়ার ফলে হয়। ছানিজনিত অন্ধত্ব সাধারণত একটি সহজ ও তুলনামূলক কম খরচের অপারেশনের মাধ্যমে ভালো হয়ে যায়, যেখানে ঘোলাটে লেন্সের পরিবর্তে কৃত্রিম স্বচ্ছ লেন্স বসিয়ে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে চোখের দৃষ্টি রক্ষায় কী কী করা উচিত?
বাংলাদেশে চোখের দৃষ্টি রক্ষার জন্য নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা জরুরি, বিশেষ করে ৪০ বছরের পর বা ডায়াবেটিস থাকলে; চোখে স্থায়ী ব্যথা, লাল হওয়া, ঝাপসা দেখা, হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়া বা আলো ফ্ল্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে; শিশুরা যদি ব্ল্যাকবোর্ড পরিষ্কার না দেখতে পায়, খুব কাছ থেকে বই পড়ে বা টিভি দেখে, মাথাব্যথা হয় – তাহলে তাদের চোখ পরীক্ষা করাতে হবে; ধুলাবালি বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে চোখে সুরক্ষা চশমা ব্যবহার করতে হবে; প্রচুর ভাজাপোড়া, ধূমপান ও অস্বাস্থ্যকর খাবার কমিয়ে শাকসবজি ও ফল বেশি খেতে হবে; এবং বয়স্ক আত্মীয়ের ছানি হলে ভয় না পেয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী অপারেশন করাতে সহযোগিতা করতে হবে।
এই পাতা শেয়ার করুন