প্রতি বছর ১ থেকে ৭ আগস্ট বিশ্ব বুকের দুধ পান সপ্তাহ পালিত হয়। এ সপ্তাহের মূল লক্ষ্য হলো বুকের দুধের সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, মায়েদের বাস্তব সহায়তা নিশ্চিত করা এবং নীতিগত পর্যায়ে এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে মায়েরা নিশ্চিন্তে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন।
History
বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ প্রথম পালন করা হয় ১৯৯২ সালে, ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং অ্যাকশন (WABA) এর উদ্যোগে, ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর সহযোগিতায়। এর পেছনে ভিত্তি ছিল ১৯৯০ সালের ইনোচেন্তি ডিক্লারেশন, যেখানে সরকারগুলোকে বুকের দুধের সুরক্ষা, প্রসার ও সহায়তার জন্য সুপারিশ করা হয়।
এরপর থেকে ১-৭ আগস্ট তারিখকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর শতাধিক দেশে সচেতনতা কর্মসূচি, প্রশিক্ষণ, আলোচনা ও প্রচারণা চালানো হয়। প্রতিবছরের থিম অনুযায়ী কখনো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও হাসপাতালের সহায়তা, কখনো পরিবার ও কমিউনিটির ভূমিকা, কখনো কর্মজীবী মায়েদের মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা আবার কখনো পুষ্টি ও স্থায়ী উন্নয়নের সঙ্গে বুকের দুধের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
WHO ও ইউনিসেফের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুর জীবনের প্রথম ৬ মাস শুধুই মায়ের বুকের দুধ দেওয়া উচিত, এর বাইরে পানি, মধু বা অন্য কোনো খাবার প্রয়োজন হয় না (প্রয়োজন হলে ওষুধ বা ভিটামিন ছাড়া)। ৬ মাস পর থেকে ধীরে ধীরে উপযুক্ত ঘরে তৈরি খাবার শুরু করে ২ বছর বা তার বেশি সময় পর্যন্ত বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া ভালো।
বুকের দুধ শিশুর জন্য এমন পূর্ণাঙ্গ ও পরিবর্তনশীল পুষ্টি জোগায় যা শিশুর বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী মানিয়ে যায়। এতে থাকা অ্যান্টিবডি ও রোগ প্রতিরোধী উপাদান ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, কানে ইনফেকশন ও অপুষ্টির ঝুঁকি কমায়। বুকের দুধ শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশেও সহায়ক এবং ভবিষ্যতে স্থূলতা ও কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে বলে অনেক গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে।
মায়ের স্বাস্থ্যও এতে উপকৃত হয়। বুকের দুধ খাওয়ালে প্রসবের পর জরায়ু দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, রক্তক্ষরণ কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। পাশাপাশি মা ও শিশুর মানসিক বন্ধন আরও মজবুত হয়।
তবুও বাস্তবে অনেক মা বাধার মুখে পড়েন। সঠিক তথ্যের অভাব, ফর্মুলা দুধের আক্রমণাত্মক বিজ্ঞাপন, স্বল্প বা বেতনবিহীন মাতৃত্বকালীন ছুটি, কর্মস্থলে বুকের দুধ খাওয়ানো বা দুধ সংগ্রহের জন্য নিরাপদ স্থান ও সময়ের অভাব, এবং নানা ভুল ধারণা অনেক সময় একচেটিয়া বুকের দুধ পানে বাধা দেয়। বিশ্ব বুকের দুধ পান সপ্তাহ এসব বাধাকে চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য নীতিনির্ধারক, সেবা প্রদানকারী ও পরিবারকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানায়।
মূল তথ্য
বিশ্বব্যাপী উদ্যোগ
- ১৯৯২ সাল থেকে WABA
- WHO ও ইউনিসেফের সহায়তায় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালিত হচ্ছে।
একচেটিয়া বুকের দুধ
- WHO শিশুর প্রথম ৬ মাস কেবল বুকের দুধ দেওয়ার পরামর্শ দেয়।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা
- বুকের দুধ শিশুর ডায়রিয়া
- নিউমোনিয়া
- সংক্রমণ ও অপুষ্টির ঝুঁকি কমায়।
মায়ের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী
- বুকের দুধ খাওয়ানো মায়ের দেহে কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে এবং মানসিক সুস্থতায় ভূমিকা রাখে।
খরচ ও পরিবেশবান্ধব
- বুকের দুধ পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব
- কারণ এতে আলাদা বোতল
- টিন বা জ্বালানি লাগে না।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশে মাতৃত্ব ও শিশু স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বুকের দুধ পানের প্রসারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। জাতীয় জরিপগুলোতে দেখা যায়, জন্মের পরপরই বুকের দুধ শুরু করা এবং প্রথম ৬ মাস একচেটিয়া বুকের দুধ দেওয়ার হার দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বেশ ভালো, যদিও শহর ও গ্রামের মধ্যে এবং ধনী ও দরিদ্র পরিবারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশ বুকের দুধের বিকল্প (BMS) আইন প্রণয়ন করেছে, যা শিশুদের জন্য তৈরি ফর্মুলা ও অনুরূপ পণ্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ করে, যেন এ ধরনের প্রচারণা মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে।
কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীরা গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের সঙ্গে পরামর্শের সময় জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ দেওয়া, কলোস্ট্রাম ফেলে না দেওয়া, প্রথম ৬ মাস কোনো পানি বা অন্য খাবার না দেওয়া এবং ৬ মাস পর থেকে পরিপূরক খাবার চালু করার পরও ২ বছর বা তার বেশি সময় বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন।
বিশ্ব বুকের দুধ পান সপ্তাহ উপলক্ষে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, হাসপাতাল, চিকিৎসক সংগঠন, এনজিও ও গণমাধ্যমের উদ্যোগে আলোচনা সভা, মেলা, টিভি টক শো, পোস্টার ক্যাম্পেইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। এসব বার্তায় তুলে ধরা হয় যে বুকের দুধই শিশুর জন্য প্রথম ও শ্রেষ্ঠ খাবার এবং পরিবারের সবাই মিলে মায়ের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করলে বুকের দুধ খাওয়ানো আরও সহজ হয়।
পরিবারের জন্য মূল কথা হলো, অধিকাংশ শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধই সবচেয়ে নিরাপদ, পূর্ণাঙ্গ ও সাশ্রয়ী খাবার। মা, পরিবার, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মস্থল একসঙ্গে সহায়তা করলে শিশুকে জীবনের সেরা সূচনা দেওয়া সম্ভব।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- একচেটিয়া বুকের দুধ কতদিন পান করানো উচিত?
- WHO শিশুর জীবনের প্রথম ৬ মাস শুধুই মায়ের বুকের দুধ দেওয়ার পরামর্শ দেয়, এই সময় অন্য কোনো খাবার বা পানীয় (এমনকি পানি) দেওয়ার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন হলে শুধু ওষুধ বা ভিটামিন দেওয়া যায়। ৬ মাস পর থেকে উপযুক্ত পরিপূরক খাবারের সঙ্গে ২ বছর বা তার বেশি সময় পর্যন্ত বুকের দুধ চালিয়ে যেতে বলা হয়।
- বাংলাদেশে বুকের দুধ পান রক্ষায় কি আইন আছে?
- হ্যাঁ। বাংলাদেশে বুকের দুধের বিকল্প (BMS) আইন রয়েছে, যা শিশু ফর্মুলা ও অনুরূপ পণ্যের আক্রমণাত্মক বিজ্ঞাপন ও প্রোমোশন নিয়ন্ত্রণ করে, যেন এ ধরনের প্রচারণা মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানো থেকে নিরুৎসাহিত না করে।
- পরিবার ও কর্মস্থল কীভাবে বুকের দুধ খাওয়ানো মাকে সহায়তা করতে পারে?
- পরিবারের সদস্যরা গৃহকর্মে সাহায্য করে, মায়ের পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করে এবং একচেটিয়া বুকের দুধ পানে তাকে মানসিকভাবে উৎসাহিত করতে পারেন। কর্মস্থলে মাতৃত্বকালীন ছুটি, নমনীয় সময়সূচি, দুধ খাওয়ানোর বা দুধ সংগ্রহের জন্য বিরতি এবং দুধ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য নিরাপদ ও ব্যক্তিগত স্থান রাখা মায়েদের জন্য বড় সহায়তা হতে পারে।

