প্রতি বছর ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হয়, যার লক্ষ্য হলো জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জনসংখ্যার কাঠামো ও এর স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এ দিনটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে জনসংখ্যা শুধু সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা, লিঙ্গসমতা ও টেকসই উন্নয়নের প্রশ্ন।
History
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের ধারণা এসেছে ১৯৮৭ সালের "ফাইভ বিলিয়ন ডে" থেকে। ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই প্রতীকীভাবে ধরা হয় যে সেদিন বিশ্বের জনসংখ্যা ৫০০ কোটিতে পৌঁছেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তখন দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর সীমিত সম্পদ ও সেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সূচনা হয়।
এরপর ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (UNDP) শাসন পরিষদ ১১ জুলাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস হিসেবে পালনের সুপারিশ করে। তখন থেকে প্রতি বছর এ তারিখে জাতিসংঘ, বিভিন্ন সরকার, বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জনসংখ্যা, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য, কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য, নারী অধিকার ও লিঙ্গসমতা নিয়ে নানা কর্মসূচি আয়োজন করে আসছে।
এরই মধ্যে বৈশ্বিক জনসংখ্যা বেড়ে ২০২২ সালে ৮০০ কোটির মাইলফলক অতিক্রম করেছে। তবে সব দেশের অবস্থা এক নয়—কোথাও উচ্চ উর্বরতা ও তরুণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য, আবার কোথাও জন্মহার কমে গিয়ে জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে পড়ছে। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস জনসংখ্যা নিয়ে একতরফা ভয় বা দোষারোপ না করে, মানবাধিকারভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার আহ্বান জানায়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
দ্রুত ও অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি অনেক দেশের জন্য বড় জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। সীমিত বাজেট ও অবকাঠামোর মধ্যে যখন হাসপাতাল, স্কুল, পানীয় জল, স্যানিটেশন, খাদ্য ও কর্মসংস্থানের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে, তখন সবার জন্য মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বড় পরিবারের ক্ষেত্রে প্রতিটি সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি, টিকা, বই-খাতা ও পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে যায়।
তবে সমাধান কখনোই জোর করে জন্মনিয়ন্ত্রণ নয়; বরং মানুষের অধিকারকে সম্মান করা। বিভিন্ন গবেষণা দেখায়, যখন মেয়ে ও নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বেচ্ছামূলক, উচ্চমানের পরিবার পরিকল্পনা সেবার সুযোগ পায়, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই কম সংখ্যক ও সুস্থ সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যুহার কমে, ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ ও অবৈধ গর্ভপাত কমে এবং পরিবারগুলো অর্থনৈতিক দিক থেকেও লাভবান হয়।
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে যে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয় তার মধ্যে রয়েছে—নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতে প্রবেশাধিকার, সঠিক তথ্য ও পরামর্শ, কিশোরী মাতৃত্ব ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা রোধ এবং পুরুষদেরও পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা।
মূল তথ্য
তারিখের উৎস
- ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই "ফাইভ বিলিয়ন ডে"–সেদিন বিশ্ব জনসংখ্যা ৫০০ কোটিতে পৌঁছানোর স্মরণে এই তারিখ নির্বাচন করা হয়।
আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি
- ১৯৮৯ সালে UNDP শাসন পরিষদ ১১ জুলাইকে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়; তখন থেকে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী এ দিনটি উদ্যাপিত হচ্ছে।
জনসংখ্যা মাইলফলক
- ২০২২ সালে বিশ্ব জনসংখ্যা ৮০০ কোটি অতিক্রম করে
- যার বেশিরভাগ বৃদ্ধি অল্পসংখ্যক কিছু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে কেন্দ্রীভূত।
পরিবার পরিকল্পনার প্রভাব
- জন্ম間 ব্যবধান রাখা ও পরিকল্পিতভাবে সন্তান নেওয়ার সুযোগ দিলে মাতৃমৃত্যু
- নবজাতক ও শিশু মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও অনিরাপদ গর্ভপাতও কমে।
মনোযোগের কেন্দ্র
- কেবল সংখ্যা কমানো নয়
- বরং প্রজনন অধিকার
- লিঙ্গসমতা ও মানসম্মত সেবা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাই এ দিবসের মূল বার্তা।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশে জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা ও জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির কারণে উর্বরতার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ১৯৭০-এর দশকে যেখানে প্রতি নারীর গড়ে প্রায় ৬টি সন্তান জন্ম হতো, এখন তা প্রায় প্রতিস্থাপন পর্যায়ে (প্রায় ২ শিশু প্রতি নারী) নেমে এসেছে—যা বিশ্বব্যাপী একটি সফলতার উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশের সাফল্যের বড় ভিত্তি হলো কমিউনিটি-ভিত্তিক পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি। প্রশিক্ষিত নারী স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবার পরিকল্পনা ভিজিটররা গ্রামে-গঞ্জে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দম্পতিদের পরামর্শ দেন, মুখে খাওয়ার বা ইনজেকশনসহ নানা ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সরবরাহ করেন, প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতির জন্য ক্লিনিকে রেফার করেন এবং গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবার সঙ্গে সংযোগ ঘটান। সরকারি কর্মসূচির পাশাপাশি এনজিও ও উন্নয়ন সহযোগীরাও মাঠপর্যায়ে আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
তবে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কিশোরী ও তরুণদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা অনেক ক্ষেত্রে সহজলভ্য নয়, বিশেষ করে দূরবর্তী গ্রামাঞ্চল ও শহরের বস্তি এলাকায়। অনেক পরিবারে এখনো বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে গর্ভধারণের প্রবণতা আছে, যা মা ও শিশুর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে এবং মেয়েদের শিক্ষা ও কর্মজীবনের সুযোগ সীমিত করে দেয়। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাল্যবিবাহ রোধ, মেয়েদের উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য গোপনীয় ও সম্মানজনক সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতি বছর বাংলাদেশে এ দিনকে সামনে রেখে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, এনজিও ও স্থানীয় প্রশাসন র্যালি, আলোচনা সভা, গণমাধ্যম প্রচার, বিশেষ ক্যাম্পেইনের আয়োজন করে। এসব কর্মসূচিতে ছোট, সুখী ও পরিকল্পিত পরিবারের গুরুত্ব, জন্ম間 ব্যবধানের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা, পুরুষদের অংশগ্রহণ ও দায়িত্ব, এবং কোনোভাবেই জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণ নয়—এসব বার্তা তুলে ধরা হয়।
পরিবারের জন্য এই দিবসের বার্তা সহজ—আপনি ও আপনার সঙ্গী মিলেই ঠিক করবেন কখন ও কতটি সন্তান নেবেন। তথ্য, সেবা ও সহায়তা পাওয়ার অধিকার আপনার; সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আপনি নিজের ও সন্তানের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে, আর্থিক পরিকল্পনা করতে এবং সবার জন্য একটি ভালো ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের জন্য ১১ জুলাই কেন বেছে নেওয়া হয়েছে?
- ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই "ফাইভ বিলিয়ন ডে"–যেদিন বিশ্ব জনসংখ্যা প্রতীকীভাবে ৫০০ কোটিতে পৌঁছেছে বলে ধরা হয়েছিল। সেই ঘটনাকে স্মরণ করে ১১ জুলাইকে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
- বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে মূলত কোন কোন বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়?
- এ দিনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কাঠামো, স্বেচ্ছামূলক পরিবার পরিকল্পনা, প্রজনন স্বাস্থ্য, মাতৃস্বাস্থ্য, কিশোরী মাতৃত্ব, বাল্যবিবাহ, নারী অধিকার ও লিঙ্গসমতা, এবং সন্তান নেওয়া বা না নেওয়ার বিষয়ে মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও তথ্য পাওয়ার অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হয়।
- বাংলাদেশ কীভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে?
- বাংলাদেশে কমিউনিটি-ভিত্তিক পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরামর্শ ও পদ্ধতি সরবরাহ, সরকারি ও বেসরকারি ক্লিনিকের সেবা, এবং মাতৃ ও শিশুসেবার সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনাকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার মাধ্যমে ১৯৭০-এর দশক থেকে উর্বরতার হার অনেক কমিয়ে আনতে পেরেছে। তাই বাংলাদেশকে প্রায়ই জনসংখ্যা ও পরিবার পরিকল্পনা ক্ষেত্রে এক সফল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

