প্রতি বছর ১৭ নভেম্বর বিশ্ব সার্ভিক্যাল ক্যান্সার নির্মূল কর্মসূচি দিবস পালিত হয়, যাতে জরায়ুমুখের ক্যান্সারকে সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা এবং এটি নির্মূলের বৈশ্বিক অঙ্গীকারকে জোরদার করা যায়। সার্ভিক্যাল ক্যান্সার হলো জরায়ুমুখের (সার্ভিক্স) কোষ থেকে উৎপন্ন ক্যান্সার, যা প্রায় সবসময়ই দীর্ঘদিনের উচ্চ–ঝুঁকিসম্পন্ন এইচপিভি (HPV) সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অন্যান্য অনেক ক্যান্সারের তুলনায় সার্ভিক্যাল ক্যান্সারকে অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিরাপদ ও কার্যকর এইচপিভি ভ্যাকসিন উচ্চ–ঝুঁকির ভাইরাস টাইপ থেকে সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে এবং স্ক্রিনিং পরীক্ষার মাধ্যমে জরায়ুমুখের কোষে প্রাথমিক পরিবর্তন ধরা সম্ভব, যখন সহজ চিকিৎসায় সেগুলোকে ক্যান্সারে রূপ নেওয়ার আগেই ঠিক করা যায়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রতি বছর সারা বিশ্বে বিপুলসংখ্যক নারী সার্ভিক্যাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং অনেকেই কর্মক্ষম বয়সে, সন্তান–সংসারের দায়িত্ব সামলানোর সময় এ রোগে মারা যান। এসব মৃত্যুর বড় অংশই ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে, যেখানে এইচপিভি টিকা, স্ক্রিনিং ও ক্যান্সার চিকিৎসা সেবা সীমিত।
রোগের শুরুর দিকে সাধারণত কোনো উপসর্গ থাকে না। পরে অস্বাভাবিক যোনিপথে রক্তপাত (যেমন সহবাসের পর, মাসিকের বাইরে), দুর্গন্ধযুক্ত বা পানির মতো স্রাব, কোমর–পেলভিক ব্যথা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে—যখন প্রায়ই রোগটি অনেকটা এগিয়ে যায়। তাই কেবল উপসর্গের অপেক্ষায় না থেকে পূর্বনির্ধারিত বয়সে স্ক্রিনিং করানো অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সার্ভিক্যাল ক্যান্সার নির্মূলে ৯০–৭০–৯০ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে—১৫ বছর বয়সের আগে ৯০% মেয়েকে সম্পূর্ণ এইচপিভি টিকা দেওয়া, নির্দিষ্ট বয়সের ৭০% নারীর অন্তত দুইবার উচ্চ–মানের পরীক্ষায় স্ক্রিনিং এবং প্রাক–ক্যান্সার বা ক্যান্সার শনাক্ত হওয়া ৯০% নারীর যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
History
২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর WHO “Global Strategy to Accelerate the Elimination of Cervical Cancer as a Public Health Problem” ঘোষণা করে। এটি ছিল প্রথম কোনো ক্যান্সারকে বৈশ্বিকভাবে নির্মূলের লক্ষ্যে গৃহীত কৌশল। সেই থেকে ১৭ নভেম্বর বিশ্ব সার্ভিক্যাল ক্যান্সার নির্মূল কর্মসূচি দিবস হিসেবে পালন করা হয়, যেখানে প্রতি বছর দেশ–বিদেশের সরকার, পেশাজীবী সংগঠন ও কমিউনিটি একসঙ্গে অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করে।
এই দিনে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে এইচপিভি টিকা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, বিনা বা স্বল্প খরচে VIA বা প্যাপ স্মিয়ার স্ক্রিনিং ক্যাম্প, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যাম্পেইন এবং নীতি–সহায়তা আদায়ের চেষ্টা চলে। মূল বার্তা হচ্ছে—সার্ভিক্যাল ক্যান্সার কোনো নারীর “নিয়তি” নয়; পরীক্ষিত উপায় ব্যবহার করলে এটি অনেকটাই প্রতিরোধযোগ্য।
Key facts
HPV খুবই সাধারণ ভাইরাস
- প্রায় সব যৌন–সক্রিয় পুরুষ ও নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় একাধিক ধরনের এইচপিভি–তে আক্রান্ত হন; তবে কেবল কিছু উচ্চ–ঝুঁকিপূর্ণ টাইপের দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ থেকে কিছু নারীর জরায়ুমুখে ক্যান্সার তৈরি হয়।
প্রতিরোধ সম্ভব
- এইচপিভি টিকা
- নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং প্রাক–ক্যান্সার ক্ষত দ্রুত চিকিৎসা করলে সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের অধিকাংশ ক্ষেত্রই এড়ানো যায়।
ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা রোগ
- সাধারণত অনেক বছর ধরে ধাপে ধাপে কোষের পরিবর্তন হতে হতে ক্যান্সার তৈরি হয়; তাই আগেভাগে পরীক্ষা করলে সহজেই ধরা পড়ে।
শুধু বয়স্ক নারীর রোগ নয়
- অনেক ক্ষেত্রেই ৩০–৫০ বছর বয়সী কর্মজীবী ও গৃহিণী নারীরাই বেশি আক্রান্ত হন।
সমতার প্রশ্ন
- গ্রামাঞ্চল ও দরিদ্র এলাকার নারীরা টিকা
- স্ক্রিনিং ও উন্নত চিকিৎসা পাওয়ায় বঞ্চিত থাকেন—ফলে তাদের ঝুঁকি বেশি।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশে নারীদের ক্যান্সারের মধ্যে সার্ভিক্যাল ক্যান্সার অন্যতম শীর্ষ কারণ। অনেক নারী লজ্জা, কুসংস্কার, দারিদ্র্য বা সেবা–কেন্দ্রের দূরত্বের কারণে দেরি করে ডাক্তার দেখান, ফলে রোগ প্রায়ই শেষ পর্যায়ে ধরা পড়ে।
সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে বর্তমানে বহু জেলা হাসপাতাল, মা–ও–শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, মেডিকেল কলেজ ও এনজিও ক্লিনিকে VIA পদ্ধতিতে জরায়ুমুখের স্ক্রিনিং করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে “screen‑and‑treat” পদ্ধতিতে একই দিনে প্রাক–ক্যান্সার ক্ষত থাকলে সহজ কিছু চিকিৎসা দেওয়া হয়।
বিশ্ব সার্ভিক্যাল ক্যান্সার নির্মূল কর্মসূচি দিবসে বাংলাদেশে স্ত্রীরোগ ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্যবিদ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এনজিওগুলো সচেতনতা সভা, বিনামূল্যের VIA স্ক্রিনিং ক্যাম্প, টকশো, প্রচারপত্র ও ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের আয়োজন করে। নারীদের জানানো হয়—সহবাসের পর বা মাসিকের বাইরে রক্তপাত, দীর্ঘদিনের দুর্গন্ধযুক্ত বা পানির মতো স্রাব, কোমর–পেটে স্থায়ী ব্যথা থাকলে দেরি না করে গাইনোকোলজিস্ট বা সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
একই সঙ্গে কিশোরী মেয়েদের জন্য এইচপিভি টিকা কার্যক্রম চালু ও সম্প্রসারণ, নিয়মিত পরিবার–পরিকল্পনা বা মাতৃত্বসেবা নিতে আসা নারীদের সার্ভিক্যাল স্ক্রিনিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং নারীদের স্বাস্থ্য–সমস্যা নিয়ে লজ্জা বা ভয় কাটিয়ে উঠতে সামাজিক সহায়তা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশে এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বল্প ব্যয়ে, সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে মায়েদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব এবং এটি আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- বিশ্ব সার্ভিক্যাল ক্যান্সার নির্মূল কর্মসূচি দিবস কী?
- প্রতি বছর ১৭ নভেম্বর পালিত বিশ্ব সার্ভিক্যাল ক্যান্সার নির্মূল কর্মসূচি দিবস হলো এমন একটি দিন, যেদিন এইচপিভি টিকা, নিয়মিত স্ক্রিনিং ও সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে জরায়ুমুখের ক্যান্সারকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নির্মূল করার বৈশ্বিক লক্ষ্যকে সামনে আনা হয়।
- সার্ভিক্যাল ক্যান্সার কি প্রতিরোধ করা যায়?
- হ্যাঁ। বেশিরভাগ সার্ভিক্যাল ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব—যদি কিশোরী মেয়েদের সময়মতো এইচপিভি টিকা দেওয়া যায়, নির্দিষ্ট বয়সে নারীরা VIA বা প্যাপ স্মিয়ার–এর মতো স্ক্রিনিং পরীক্ষা করান এবং জরায়ুমুখে প্রাক–ক্যান্সার পরিবর্তন ধরা পড়লে দ্রুত চিকিৎসা করা হয়।
- বাংলাদেশে কোন লক্ষণ দেখা দিলে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ব্যাপারে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত?
- সহবাসের পর বা মাসিকের বাইরে অস্বাভাবিক রক্তপাত, দীর্ঘদিন ধরে দুর্গন্ধযুক্ত বা পানির মতো স্রাব, সহবাসে ব্যথা, নিচের পেট ও কোমরে স্থায়ী ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত গাইনোকোলজিস্ট বা সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। এছাড়া যেসব নারীর বয়স স্ক্রিনিং–উপযোগী, কিন্তু কখনো VIA বা প্যাপ স্মিয়ার করাননি, তাদেরও পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।

