প্রতি বছর নভেম্বরের তৃতীয় বুধবার বিশ্ব সিওপিডি দিবস পালিত হয়। এ দিবসের লক্ষ্য হলো ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD) বা দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টজনিত ফুসফুসের রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, যাতে মানুষ দীর্ঘদিনের কাশি ও শ্বাসকষ্টকে অবহেলা না করে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিতে পারে। দিবসটির সমন্বয় করে গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ লাং ডিজিজ (GOLD), যেখানে বিশ্বব্যাপী ফুসফুস বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য সংগঠনগুলো অংশ নেয়।
History
২০০২ সালে GOLD প্রথম বিশ্ব সিওপিডি দিবস চালু করে। ততদিনে সিওপিডি বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর একটি বড় কারণ হয়ে উঠলেও এটি সম্পর্কে জনসচেতনতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল এবং অনেক রোগী কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে রোগ নির্ণয় করাতেই আসতেন না। তাই ধূমপান, রান্নার ধোঁয়া ও বায়ুদূষণের মতো ঝুঁকির কারণের বিরুদ্ধে জোরালো বার্তা দেওয়া এবং শ্বাসকষ্টকে প্রাথমিক পর্যায়ে চিনে নেওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে একটি বৈশ্বিক দিবসের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরপর থেকে প্রতি বছর নভেম্বরের তৃতীয় বুধবার আলাদা আলাদা থিম নিয়ে বিশ্ব সিওপিডি দিবস পালিত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট, পেশাজীবী সংগঠন ও রোগী গ্রুপগুলো ফ্রি স্পাইরোমেট্রি (ফুসফুস পরীক্ষা) ক্যাম্প, ধূমপান ত্যাগ ক্লিনিক, জনসচেতনতা সভা, র্যালি ও গণমাধ্যম আলোচনার আয়োজন করে। লক্ষ্য একটাই – দীর্ঘদিনের কাশি, কফ, হাঁপিয়ে যাওয়া বা সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হওয়াকে যেন “বয়স হয়েছে” বা “সিগারেট খাই তাই” বলে হালকা ভাবে না নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
সিওপিডি বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় এবং এটি বহু মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম, হাঁটাচলা ও দৈনন্দিন জীবনের মানকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। সাধারণত বছরের পর বছর ধূমপানের ধোঁয়া, রান্নার চুলার ধোঁয়া, ধুলাবালি বা রাসায়নিক গ্যাসের মতো ক্ষতিকর কণার সংস্পর্শে থেকে ফুসফুস ও শ্বাসনালির ভেতর দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও ক্ষতি হলে সিওপিডি তৈরি হয়।
প্রধান লক্ষণের মধ্যে আছে দীর্ঘমেয়াদি কাশি, কফ ওঠা, একটু হাঁটলেই শ্বাসকষ্ট বা হাঁপ ধরে যাওয়া, বুকে চাপ লাগা এবং বারবার বুকে সংক্রমণ হওয়া। অনেকেই এগুলোকে “স্মোকার’স কফ” বা স্বাভাবিক বয়সজনিত সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন। বিশ্ব সিওপিডি দিবসে সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় – সিওপিডি প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিত্সাযোগ্য রোগ। ধূমপান সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা, ধোঁয়া ও ধুলাবালি থেকে বাঁচা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনহেলার ঠিকমতো ব্যবহার করা, নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম করা এবং প্রয়োজনে পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন নিলে রোগের অগ্রগতি ধীর করা ও জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত করা সম্ভব।
প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করার জন্য স্পাইরোমেট্রি নামের সহজ ফুসফুস পরীক্ষার গুরুত্বও এই দিবসে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। ঝুঁকিতে থাকা এবং দীর্ঘদিন কাশি বা শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষদের বক্ষরোগ বিশেষজ্ঞ বা পালমোনোলজিস্টের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করাতে উৎসাহ দেওয়া হয়, যাতে ফুসফুস পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার আগেই চিকিৎসা শুরু করা যায়।
মূল তথ্য
শুরুর বছর
- ২০০২ সাল থেকে গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ লাং ডিজিজ (GOLD) বিশ্ব সিওপিডি দিবস আয়োজন করছে।
বিশ্বব্যাপী বোঝা
- সিওপিডি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার বড় উৎস।
মূল ঝুঁকির কারণ
- ধূমপান বিশ্বব্যাপী সিওপিডির প্রধান কারণ; পাশাপাশি রান্নার ধোঁয়া
- ঘরের ও বাইরের বায়ুদূষণ
- ধুলাবালিযুক্ত কর্মক্ষেত্র ও শ্বাসতন্ত্রের বারবার সংক্রমণও ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রতিরোধ
- ধূমপান বন্ধ করা
- পরোক্ষ ধূমপান ও রান্নার ধোঁয়া কমানো
- কর্মস্থলে মাস্ক ব্যবহার
- ফুসফুসের সংক্রমণ দ্রুত চিকিৎসা এবং ফ্লু ও নিউমোনিয়ার টিকা নেওয়া – সব মিলিয়ে সিওপিডি ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশে সিওপিডি একটি উল্লেখযোগ্য কিন্তু অনেক সময় অবমূল্যায়িত জনস্বাস্থ্য সমস্যা। শহর ও গ্রামে প্রচুর সংখ্যক পুরুষ সিগারেট ও বিড়ি ধূমপান করেন, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের ফুসফুসে স্থায়ী ক্ষতি করে। অন্যদিকে গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারের অনেক নারী ঘরের ভেতরে কাঠ, খড়, গোবর বা কয়লা দিয়ে রান্না করেন; চুলার ধোঁয়া রান্নাঘর ও ঘরে জমে থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে যায়। ফলে কখনও ধূমপান না করেও অনেক নারী সিওপিডিতে আক্রান্ত হন।
এ ছাড়া ব্রিকফিল্ড, গার্মেন্টস বা ধুলাবালিযুক্ত অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে কাজ করা মানুষজনও দীর্ঘদিন ধুলো-ধোঁয়ার সংস্পর্শে থেকে COPD’র ঝুঁকিতে থাকেন। শহরের বায়ুদূষণ – যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পকারখানা ও ইটভাটার ধোঁয়া – এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্ব সিওপিডি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে বক্ষরোগ বিশেষজ্ঞ, পালমোনোলজিস্ট, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বিভিন্ন হাসপাতালে ফ্রি স্পাইরোমেট্রি ক্যাম্প, ধূমপান ত্যাগ ক্লিনিক, টকশো, সেমিনার ও সচেতনতা র্যালির আয়োজন করেন। মানুষের মধ্যে বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় – “বছরের পর বছর কাশি থাকাটা স্বাভাবিক নয়”, “সিঁড়ি ভাঙতেই হাঁপিয়ে যাওয়া বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া সিওপিডির লক্ষণ হতে পারে”, তাই এসব লক্ষণকে হালকা ভাবে না নিয়ে দ্রুত ডাক্তারের সাথে দেখা করা জরুরি।
একই সঙ্গে ধোঁয়াবিহীন রান্নাঘর, উন্নত চুলা ও পরিষ্কার জ্বালানির ব্যবহার, কঠোর তামাকনিয়ন্ত্রণ আইন, ধূমপানমুক্ত জনসমাগম স্থান ও সাশ্রয়ী ইনহেলার ও ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সঠিক প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ, প্রাথমিক নির্ণয় ও নিয়মিত ফলো-আপ যত্ন বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশে সিওপিডি-জনিত শ্বাসকষ্ট ও অকাল মৃত্যু অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- সিওপিডির প্রধান কারণ কী?
- বিশ্বব্যাপী সিওপিডির প্রধান কারণ হলো তামাক ধূমপান – সিগারেট, বিড়ি ইত্যাদি। তবে দীর্ঘদিন ধরে কাঠ, খড়, গোবর বা কয়লার ধোঁয়ায় রান্না করা, রান্নাঘরের ধোঁয়া, পরোক্ষ ধূমপান, ধুলাবালি ও রাসায়নিক গ্যাসযুক্ত কর্মক্ষেত্রে কাজ করা এবং বাইরের বায়ুদূষণও বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে সিওপিডির গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ।
- সিওপিডি কি পুরোপুরি নিরাময় করা যায়?
- সাধারণত সিওপিডিতে ফুসফুসের যে কাঠামোগত ক্ষতি হয়, তা পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না; অর্থাৎ রোগটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়। তবে ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা, ধোঁয়া ও ধুলাবালি থেকে দূরে থাকা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনহেলার ব্যবহার, নিয়মিত হাঁটাচলা ও পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন নিলে রোগের অগ্রগতি অনেক ধীর করা, শ্বাসকষ্ট কমানো এবং স্বাভাবিক কাজকর্ম করার ক্ষমতা অনেক বাড়ানো যায়।
- সিওপিডির সাধারণ লক্ষণ কী কী?
- বছরের পর বছর ধরে থাকা কাশি, প্রায়ই কফ ওঠা, হাঁটলেই বা সিঁড়ি ভাঙলেই শ্বাসকষ্ট হয়ে হাঁপিয়ে যাওয়া, বুক ভারী বা চাপ লাগা, বারবার বুকে সংক্রমণ বা সর্দি-কাশি থেকে সেরে না ওঠা – এগুলো সিওপিডির সাধারণ লক্ষণ। এমন লক্ষণ থাকলে এবং ধূমপান বা ধোঁয়ার সংস্পর্শের ইতিহাস থাকলে দ্রুত বক্ষরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করে স্পাইরোমেট্রি পরীক্ষা করানো উচিত।

