মূল কন্টেন্টে যান

আমরা নিয়মিত তথ্য যোগ ও যাচাই করছি। কোনো তথ্য অনুপস্থিত বা ভুল মনে হলে আমাদের জানান, আমাদের টিম কাজ করছে। জানান

MedIndex
World Pneumonia Day illustration showing a young child being examined by a doctor with a stethoscope, lungs highlighted with infection, and vaccine vials and clean cooking icons symbolizing prevention

স্বাস্থ্য দিবসNovember 12

বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস

প্রতি বছর ১২ নভেম্বর বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস পালিত হয়। এ দিনের মূল লক্ষ্য হলো – নিউমোনিয়া যে একটি প্রাণঘাতী কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য ফুসফুসের সংক্রমণ, বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য, তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা এবং সহজ ব্যবস্থার মাধ্যমে কীভাবে অসংখ্য শিশুর জীবন বাঁচানো যায় তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া।

History

২০০৯ সালে গ্লোবাল কোয়ালিশন এগেইনস্ট চাইল্ড নিউমোনিয়া (Global Coalition against Child Pneumonia) – যেখানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সিভিল সোসাইটি একত্র হয় – প্রথম বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস চালু করে। এর আগে শিশুমৃত্যুর বড় কারণ হওয়া সত্ত্বেও নিউমোনিয়াকে প্রায়ই “অবহেলিত ঘাতক” হিসেবে দেখা হতো; তাই আলাদা একটি বৈশ্বিক সচেতনতা দিবসের মাধ্যমে এ সমস্যাকে সামনে আনা ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।

এর পর থেকে WHO, UNICEF, Gavi, বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এনজিওগুলো প্রতি বছর ১২ নভেম্বর নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করছে। কোথাও কমিউনিটি মিটিং ও স্বাস্থ্যশিক্ষা সেশন, কোথাও টিকাদান ক্যাম্প, গণমাধ্যমে আলোচনা, স্কুলে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান ও সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে অভিভাবক, স্বাস্থ্যকর্মী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়।

নিউমোনিয়া হলো ফুসফুসের সংক্রমণ, যেখানে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে ফুসফুসের ছোট ছোট বায়ুথলি (এলভিওলাই) পুঁজ ও তরলে ভরে যায়, ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ছোট শিশুদের ফুসফুস ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও পূর্ণ বিকশিত না হওয়ায় তারা দ্রুত মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। অপুষ্টি, জন্মের সময় কম ওজন, একচেটিয়া বুকের দুধ না পাওয়া, ভিড় ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকা, ঘরের ভেতরে ধোঁয়ায় ভরা চুলা ব্যবহার এবং টিকা সম্পূর্ণ না হওয়া – এসব কারণে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি আরও বাড়ে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ

দুঃখজনক হলেও সত্য, নিউমোনিয়ায় যে সংখ্যক শিশু মারা যায়, তার বেশিরভাগ মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। পুরো টিকাদান কভারেজ (বিশেষ করে PCV, Hib, measles, pertussis ইত্যাদি), জন্মের পর থেকে অন্তত প্রথম ৬ মাস একচেটিয়া বুকের দুধ খাওয়ানো, পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা, নিয়মিত হাত ধোয়া, ঘরের ভেতরে ধোঁয়া কমানো এবং অসুস্থ হলে দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক ও প্রয়োজনে অক্সিজেন চিকিৎসা – এ সব মিলিয়ে শিশুর নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যু অনেক কমানো যায়।

বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবসে বারবার বলা হয় – অভিভাবকদের নিউমোনিয়ার সতর্কতা লক্ষণগুলি চিনতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত শ্বাস নেওয়া, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা বুক ভেতরে দেবে যাওয়া, টানা কাশি, জ্বর, বুকের ব্যথা, দুধ বা খাবার খেতে না চাওয়া, অস্বাভাবিকভাবে ঘুমিয়ে পড়া বা ঠোঁট ও আঙুল নীলচে হয়ে যাওয়া – এসবই বিপদের সঙ্কেত। এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ যোগ্য স্বাস্থ্যকর্মী বা হাসপাতালে নিতে হবে; ঘরোয়া চিকিৎসা বা অপেক্ষার কারণে দেরি করলে অবস্থার অবনতি হতে পারে।

নীতিগতভাবে এ দিবস স্মরণ করিয়ে দেয় যে নিউমোনিয়া প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত কর্মী, প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক, অক্সিজেন সরবরাহ, পালস অক্সিমিটার ও শিশু-বান্ধব সেবা জরুরি। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন রান্নার জ্বালানি ব্যবহার, ঘরের ভিড় কমানো, পুষ্টি ও টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করাও গুরুত্বপূর্ণ।

মূল তথ্য

শুরুর বছর

  • ২০০৯ সালে গ্লোবাল কোয়ালিশন এগেইনস্ট চাইল্ড নিউমোনিয়া প্রথম বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস চালু করে।

প্রধান সংক্রামক ঘাতক

  • বিশ্বব্যাপী ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে অন্য যেকোনো একক সংক্রামক রোগের চেয়ে নিউমোনিয়ায় বেশি শিশু মারা যায়।

টিকার ভূমিকা

  • নিউমোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিন (PCV)
  • Hib
  • measles ইত্যাদি টিকা নিউমোনিয়ার অনেক গুরুতর কারণ থেকে সুরক্ষা দেয়।

প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু

  • টিকাদান
  • একচেটিয়া বুকের দুধ
  • পুষ্টি
  • পরিচ্ছন্ন বায়ু ও দ্রুত চিকিৎসা – এ সবের মাধ্যমে শিশুদের নিউমোনিয়াজনিত অধিকাংশ মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বাংলাদেশে

বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ এখনও নিউমোনিয়া। দরিদ্রতা, অপুষ্টি, ঘিঞ্জি পরিবেশ, ঘরের ভেতরে কুয়াশাচ্ছন্ন চুলার ধোঁয়া, সময়মতো টিকা না নেওয়া এবং বিলম্বে চিকিৎসা নেওয়া – এসব কারণে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। অনেক সময় অভিভাবকরা দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বা বুক ভেতরে দেবে যাওয়াকে সর্দি-কাশি বলে গুরুত্ব দেন না, ফলে গুরুতর অবস্থা হওয়ার আগে হাসপাতালে পৌঁছানো হয় না।

বাংলাদেশের জাতীয় EPI কর্মসূচিতে নিউমোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিন (PCV) অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নিউমোনিয়ার অনেক গুরুতর কেস কমাতে সহায়তা করছে। পাশাপাশি measles, Hib ও pertussis টিকার ভালো কভারেজ শিশুদের বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে রক্ষা করছে। কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্যকর্মী ও এনজিওরা একচেটিয়া বুকের দুধ খাওয়ানো, পুষ্টিকর খাবার ও হাত ধোয়ার অভ্যাস নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে প্রচার চালাচ্ছেন।

বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস উপলক্ষে দেশে শিশু বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন সংগঠন মিডিয়া আলোচনা, জনসচেতনতা সভা, পোস্টার ও লিফলেট বিতরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা প্রচারের মাধ্যমে বাবা-মাকে সতর্ক করেন – শিশু দ্রুত শ্বাস নিলে, বুক ভেতরে দেবে গেলে, জ্বর ও কাশি থাকলে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান। একই সঙ্গে নিউমোনিয়া রোগীদের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ, পালস অক্সিমিটার, যথেষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক এবং IMCI প্রশিক্ষিত কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

টিকাদান, পুষ্টি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও দ্রুত চিকিৎসা – এই চার স্তম্ভকে শক্তিশালী করে যদি বাংলাদেশ নিউমোনিয়া নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে যেতে পারে, তবে অসংখ্য শিশুর জীবন বাঁচানো এবং শিশুমৃত্যুর হার কমানো সম্ভব হবে। বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস এ প্রচেষ্টার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মরণ ও উদ্বুদ্ধ করার দিন হিসেবে কাজ করে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

শিশুদের নিউমোনিয়ার লক্ষণ কী কী?
শিশুর নিউমোনিয়ায় সাধারণ লক্ষণের মধ্যে থাকে দ্রুত বা কষ্ট করে শ্বাস নেওয়া, শ্বাস নেওয়ার সময় বুক বা পাঁজর ভেতরে দেবে যাওয়া (চেস্ট ইনড্রয়িং), ক্রমাগত কাশি, জ্বর, দুধ বা খাবার কম খাওয়া, অস্বাভাবিকভাবে ঘুমিয়ে পড়া বা ঝিমিয়ে থাকা এবং কখনও ঠোঁট ও আঙুল নীলচে হয়ে যাওয়া বা বুকে ব্যথা। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকর্মী বা হাসপাতালে যেতে হবে।
নিউমোনিয়ার বিরুদ্ধে কি টিকা আছে?
হ্যাঁ, নিউমোকক্কাল কনজুগেট টিকা (PCV) নিউমোনিয়ার একটি বড় ব্যাকটেরিয়াল কারণ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং এটি বাংলাদেশের নিয়মিত শিশু টিকাদান (EPI) সময়সূচির অংশ। এছাড়া Hib, measles ও pertussisসহ অন্যান্য টিকাও নিউমোনিয়ার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অভিভাবক হিসেবে আমি কীভাবে আমার শিশুর নিউমোনিয়ার ঝুঁকি কমাতে পারি?
শিশুর নিউমোনিয়ার ঝুঁকি কমাতে সময়মতো সব টিকা দেওয়া, জন্মের পর অন্তত প্রথম ৬ মাস একচেটিয়া বুকের দুধ খাওয়ানো, পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া, ঘরের ভেতর ধোঁয়া কমানো বা পরিষ্কার জ্বালানি ব্যবহার করা, নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং শিশু দ্রুত বা কষ্ট করে শ্বাস নিলে, কাশি ও জ্বর হলে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকর্মী বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পর্কিত স্বাস্থ্য দিবস

এই পাতা শেয়ার করুন