প্রতি বছর ৩ মার্চ বিশ্ব শ্রবণ দিবস পালিত হয় শ্রবণশক্তি হ্রাস, কানের রোগ এবং জীবনভর সঠিক শ্রবণ সেবার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)–এর উদ্যোগে এই দিবসে সরকার, কান–নাক–গলা (ENT) বিশেষজ্ঞ, অডিওলজিস্ট, শিক্ষক ও কমিউনিটি একসাথে কাজ করে নিরাপদে শব্দ শোনা, প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা শনাক্তকরণ এবং শ্রবণযন্ত্র ও পুনর্বাসন সেবার সহজলভ্যতা নিয়ে জনসচেতনতা গড়ে তোলে। দিবসটি মনে করিয়ে দেয় যে ভালো শ্রবণ ও যোগাযোগ ক্ষমতা শিক্ষা, কাজ, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অধিকাংশ প্রতিরোধযোগ্য শ্রবণ সমস্যা সহজ কিছু পদক্ষেপ নিলে এড়ানো সম্ভব।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
শ্রবণ সমস্যা বয়স নির্বিশেষে যে কারও হতে পারে এবং প্রায়ই ধীরে ধীরে বাড়ায়, ফলে অনেকেই দীর্ঘ সময় নির্ণয় ও সহায়তা ছাড়াই কাটিয়ে দেন। শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিহীন শ্রবণ সমস্যা কথা বলা শেখা, উচ্চারণ, পড়াশোনা ও সহপাঠীদের সাথে মেলামেশায় বড় বাধা তৈরি করে, যা স্কুলে পিছিয়ে পড়া ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি বাড়ায়। বড়দের মধ্যে শ্রবণশক্তি হ্রাস অনেক সময় কথাবার্তা এড়িয়ে চলা, কাজের জায়গায় সমস্যা, একাকীত্ব, উদ্বেগ বা বিষণ্নতার কারণ হয়। অনেক দেশে এখনো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কান–শ্রবণ সেবা পুরোপুরি একীভূত হয়নি এবং শ্রবণযন্ত্র বা ককলিয়ার ইমপ্লান্ট–এর মতো প্রযুক্তি অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে।
বিশ্ব শ্রবণ দিবস গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি দেখায় যে প্রায় অর্ধেক শ্রবণ সমস্যা প্রতিরোধযোগ্য। দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দে থাকা (সংগীত প্লেয়ার, যানবাহনের শব্দ, কারখানা, নির্মাণকাজ), অচিকিৎসিত কানের সংক্রমণ, জন্মের সময় জটিলতা, কিছু বিশেষ ওষুধ এবং বয়স বাড়া– এসবই সাধারণ কারণ। শিশুদের জন্য টিকা, নিরাপদ প্রসব, কান থেকে পুঁজ বা ব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া, কানে কাঠি বা অজানা ড্রপ না দেওয়া এবং সংগীত শোনা বা কর্মস্থলে কাজ করার সময় নিরাপদ শব্দমাত্রা মেনে চলা—এসব সহজ অভ্যাস ঝুঁকি কমায়। একই সাথে দিবসটি দাবি তোলে যেন স্ক্রিনিং, শ্রবণ পরীক্ষা, শ্রবণযন্ত্র, সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ সেবা ও পুনর্বাসন– সবকিছুই সবার জন্য সহজলভ্য হয়।
ইতিহাস
বিশ্ব শ্রবণ দিবসের সূচনা WHO–এর আন্তর্জাতিক কানের যত্ন দিবস থেকে, যা প্রথমে ৩ মার্চ পালিত হতো মূলত প্রতিরোধযোগ্য কানের রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে। পরে গবেষণা ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে শুধু কান নয়, পুরো শ্রবণ স্বাস্থ্য—যোগাযোগ, সহায়ক যন্ত্র ও পুনর্বাসনসহ—বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করতে এবং ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট অন হিয়ারিং–এর সাথে সামঞ্জস্য রাখতে এ দিবসের নামকরণ করা হয় বিশ্ব শ্রবণ দিবস।
বছর ধরে প্রতিটি বিশ্ব শ্রবণ দিবসে নির্দিষ্ট একটি থিম নির্ধারণ করা হয়, যেমন শিশুর প্রাথমিক শ্রবণ স্ক্রিনিং, তরুণদের জন্য নিরাপদে গান শোনা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কান ও শ্রবণ সেবা যুক্ত করা বা শ্রবণ সেবায় বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল। এসব থিমকে ঘিরে বিভিন্ন দেশে সেমিনার, বিনামূল্যে শ্রবণ পরীক্ষা, গণমাধ্যম প্রচারণা, স্কুলভিত্তিক কার্যক্রম ও অনলাইন ক্যাম্পেইন আয়োজিত হয়। ক্রমে আরও বেশি দেশ কান ও শ্রবণ সংক্রান্ত নীতি ও আইন গ্রহণ করায়, বিশ্ব শ্রবণ দিবস এ ক্ষেত্রের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সম্পদের দাবিকে জোরালো করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগে পরিণত হয়েছে।
মূল তথ্য
Common conditions
- বয়সজনিত শ্রবণ সমস্যা
- শব্দজনিত শ্রবণ সমস্যা
- দীর্ঘস্থায়ী কানের সংক্রমণ
- কানের পর্দা ছিদ্র
- কানে ময়লা জমে থাকা
- জন্মগত শ্রবণ সমস্যা
- ভারসাম্যজনিত ব্যাধি
Global burden
- বিপুলসংখ্যক মানুষ কোনো না কোনো শ্রবণ সমস্যায় ভোগেন
- অনেকেরই শ্রবণ সেবার প্রয়োজন
- নিম্ন সম্পদসম্পন্ন দেশে প্রভাব বেশি
- শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বড় ক্ষতি
Risk factors
- উচ্চ শব্দে গান বা শব্দদূষণ
- কানের সংক্রমণের চিকিৎসা না করা
- জন্মের সময় জটিলতা
- কিছু বিশেষ ওষুধ
- মাথায় আঘাত
- বয়স বৃদ্ধির প্রভাব
- নিয়মিত শ্রবণ পরীক্ষা না করা
Prevention methods
- নিরাপদে শব্দ শোনা
- কানের সংক্রমণে দ্রুত চিকিৎসা
- শিশুদের নিয়মিত টিকা
- প্রয়োজনে কান রক্ষা করার ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার
- কানে ক্ষতিকর নিজস্ব চিকিৎসা এড়ানো
- নিয়মিত শ্রবণ স্ক্রিনিং
Who is affected
- নবজাতক ও শিশু
- স্কুল শিক্ষার্থী
- কারখানা ও পরিবহন কর্মী
- বয়স্ক মানুষ
- শব্দদূষণপূর্ণ শহরের বাসিন্দা
- পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও যত্নদাতা
বাংলাদেশে
বাংলাদেশে কানের রোগ ও শ্রবণ সমস্যা অনেক হলেও প্রায়ই তা নজরে আসে না। বিশেষ করে শিশুদের দীর্ঘস্থায়ী কানের সংক্রমণ, কান থেকে পুঁজ পড়া বা বারবার কানব্যথা হলে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলে স্থায়ী শ্রবণশক্তি হ্রাস হতে পারে। অনেক মানুষ গার্মেন্টস কারখানা, যানবাহন টার্মিনাল, ওয়ার্কশপ বা নির্মাণস্থলে দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দে কাজ করেন কিন্তু পর্যাপ্ত কানের সুরক্ষা ব্যবহার করেন না, ফলে শব্দজনিত শ্রবণ সমস্যা বাড়ে। নিরাপদে শব্দ শোনা সম্পর্কে অজ্ঞতা, কানে কাঠি বা অন্যান্য বস্তু ব্যবহার করার অভ্যাস এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে দেরি করা—এসব কারণে প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতি আরও বেড়ে যায়।
বিশ্ব শ্রবণ দিবস বাংলাদেশে এসব সমস্যার সমাধানে সচেতনতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ENT বিশেষজ্ঞ, অডিওলজিস্ট ও জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি এ দিনে বাবা–মা ও অভিভাবকদের উৎসাহিত করেন, যেন শিশুর কান থেকে পুঁজ পড়া, জ্বর, কথা বলতে দেরি হওয়া বা ডাকে সাড়া না দেওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। তরুণদের জন্য হেডফোন ব্যবহার ও কনসার্ট বা বিয়ে–অনুষ্ঠানের উচ্চ শব্দে নিরাপদ সময় ও শব্দমাত্রা মেনে চলার বার্তা দেওয়া হয় এবং কর্মজীবী মানুষ ও নিয়োগদাতাদের কানের সুরক্ষা ও নিয়মিত শ্রবণ পরীক্ষার গুরুত্ব বোঝানো হয়।
বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত ENT ও অডিওলজি সেন্টার এবং কিছু এনজিও ৩ মার্চ–এর আগে ও পরে বিনামূল্যে শ্রবণ স্ক্রিনিং ক্যাম্প, সচেতনতামূলক সেমিনার, স্কুলভিত্তিক কান পরীক্ষা ও গণমাধ্যম কর্মসূচি আয়োজন করে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সাধারণ কানের রোগ চেনা, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া ও জটিল ক্ষেত্রে দ্রুত রেফার করার প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও বাড়ছে। একই সাথে শ্রবণযন্ত্রসহ সহায়ক ডিভাইসকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী করা এবং শ্রবণ সমস্যাযুক্ত মানুষকে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও যোগাযোগের সুযোগ, যেমন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ, নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ব শ্রবণ দিবসের বৈশ্বিক আন্দোলনের সাথে এসব স্থানীয় উদ্যোগকে যুক্ত করে বাংলাদেশ প্রতিরোধযোগ্য শ্রবণ সমস্যা কমানো এবং শ্রবণ সমস্যা নিয়ে বসবাসকারী মানুষের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- বিশ্ব শ্রবণ দিবস কী এবং কবে পালিত হয়?
- বিশ্ব শ্রবণ দিবস প্রতি বছর ৩ মার্চ পালিত একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য দিবস, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নেতৃত্ব দেয় কানের সুরক্ষা, শ্রবণ সেবা এবং প্রতিরোধযোগ্য শ্রবণশক্তি হ্রাস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য।
- বিশ্বব্যাপী কত মানুষ শ্রবণ সমস্যায় ভোগেন?
- বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ কোনো না কোনো মাত্রার শ্রবণ সমস্যায় ভোগেন এবং বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে অনেকেই সময়মতো শ্রবণ পরীক্ষা, রোগনির্ণয় বা সহায়ক ডিভাইসের সুবিধা পান না।
- বিশ্ব শ্রবণ দিবস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
- বিশ্ব শ্রবণ দিবস গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিকিৎসাবিহীন শ্রবণ সমস্যা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, অথচ অনেক কারণই প্রতিরোধযোগ্য। এ দিবস স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কান ও শ্রবণসেবাকে একীভূত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
- শ্রবণশক্তি হ্রাস কি প্রতিরোধ ও চিকিৎসা করা যায়?
- অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদে শব্দ শোনা, শিশুদের টিকা, কানের সংক্রমণের দ্রুত চিকিৎসা এবং কানে ক্ষতিকর নিজস্ব চিকিৎসা এড়িয়ে শ্রবণ সমস্যা প্রতিরোধ করা যায়, আর যাদের শ্রবণশক্তি কমে গেছে তাদের জন্য শ্রবণযন্ত্র, ইমপ্লান্ট, থেরাপি ও পুনর্বাসন উপকারী হতে পারে।
- বিশ্ব শ্রবণ দিবস অন্য স্বাস্থ্য সচেতনতা দিবস থেকে কীভাবে আলাদা?
- বিশ্ব শ্রবণ দিবস বিশেষভাবে কান ও শ্রবণ স্বাস্থ্যের ওপর জোর দেয়, যেখানে নিরাপদে শব্দ শোনা, প্রাথমিক শনাক্তকরণ, শ্রবণযন্ত্র ও যোগাযোগ সহায়তার মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যা সাধারণ প্রতিবন্ধিতা বা অন্যান্য রোগের দিবস থেকে পৃথক।
- বাংলাদেশ শ্রবণ সমস্যার মোকাবিলায় কী উদ্যোগ নিচ্ছে?
- বাংলাদেশে বিভিন্ন ENT ও অডিওলজি সেন্টার, হাসপাতাল ও এনজিও বিশ্ব শ্রবণ দিবসকে সামনে রেখে সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও স্ক্রিনিং ক্যাম্প আয়োজন করে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, সেবা সম্প্রসারণ ও সাশ্রয়ী শ্রবণযন্ত্রের প্রাপ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

