প্রতি বছর ২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবস পালিত হয়, যাতে মিঠা পানির গুরুত্ব, নিরাপদ পানীয় জল ও স্যানিটেশনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ে এবং পানি সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার সূচনা হয়। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্মেলন (UNCED)–এ এ দিবস পালনের সুপারিশ করা হয় এবং ১৯৯৩ সাল থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২২ মার্চকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব পানি দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
নিরাপদ পানি শুধু পান করার জন্য নয়, রান্না, হাত-মুখ ধোয়া, টয়লেট ব্যবহার, কৃষি, শিল্পকারখানা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার জন্যও অপরিহার্য। অথচ এখনো বিশ্বের অনেক মানুষ নিরাপদ পানীয় জল ও উপযুক্ত স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দূষিত পানি ও নোংরা পরিবেশের কারণে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস এসহ নানা অন্ত্রের সংক্রমণ ছড়ায়, যা শিশু মৃত্যুর বড় একটি কারণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কখনো অতিবৃষ্টি ও বন্যা, আবার কখনো দীর্ঘ খরা ও লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্ব পানি দিবস মনে করিয়ে দেয়, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন মানুষের মৌলিক অধিকার এবং জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি।
History
১৯৯২ সালে রিও ডি জেনিরোর আর্থ সামিটে (UN Conference on Environment and Development) বৈশ্বিক পানি সংকট ও পানি দূষণ রোধের জরুরি প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হয় এবং একটি আন্তর্জাতিক পানি দিবস পালনের প্রস্তাব আসে। একই বছরের শেষ দিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২২ মার্চকে বিশ্ব পানি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতি বছর বিভিন্ন থিমের মাধ্যমে দিবসটি পালিত হচ্ছে—যেমন পানি ও কর্মসংস্থান, বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনা, প্রকৃতি ও পানি, কাউকে পেছনে না ফেলে পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা, পানির মূল্যায়ন, ভূগর্ভস্থ পানি বা পানি ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক ইত্যাদি। এ দিবস ঘিরে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্যানিটেশন কাভারেজ বাড়ানো, গৃহস্থালি, কৃষি ও শিল্প বর্জ্য কমিয়ে পানি দূষণ রোধ এবং স্থানীয় জনগণকে পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশ্ব পানি দিবস সরাসরি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৬ (SDG 6)–এর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার লক্ষ্য সবার জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা।
Key facts
মানবাধিকার
- নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পানীয় জল এবং স্যানিটেশন সুবিধা জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত একটি মৌলিক মানবাধিকার।
স্বাস্থ্যগত প্রভাব
- অপরিষ্কার পানি ও নোংরা পরিবেশের কারণে ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ অনেক দেশে শিশু মৃত্যুর বড় কারণ হিসেবে বিদ্যমান।
নারী ও শিশু
- অনেক গ্রামে এখনো নারীদের ও কিশোরীদের দূর পথ হেঁটে পানি আনতে হয়
- যা তাদের শিক্ষা
- আয়ের সুযোগ ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে।
জলবায়ু পরিবর্তন
- জলবায়ুর প্রভাব সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে পানির মাধ্যমেই—বন্যা
- খরা
- অতিবৃষ্টি
- নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া ও উপকূলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া সরাসরি পানীয় জল ও খাদ্য উৎপাদনের ওপর আঘাত হানে।
পরিবেশ সুরক্ষা
- নদী
- হ্রদ
- জলাভূমি ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে অতিরিক্ত ব্যবহার ও দূষণ থেকে রক্ষা না করলে ভবিষ্যতে পানি নিরাপত্তা বড় সংকটে পড়বে।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও সারা বছরের জন্য সবার নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক গ্রামাঞ্চল, চর এলাকা ও শহুরে বস্তিতে নির্ভরযোগ্য নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। অগভীর নলকূপে আর্সেনিক দূষণ, শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালি বর্জ্যে নদী দূষণ, কিছু এলাকায় এখনো উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগের প্রচলন এবং উপকূলীয় জেলায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে পানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে টিউবওয়েল, ল্যাট্রিন ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষতি হলে হঠাৎ করে ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব পানি দিবসে বাংলাদেশে সরকারি দপ্তর, এনজিও, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি সংগঠনগুলো নিরাপদ পানীয় জল, প্রয়োজনে পানি ফুটিয়ে বা পরিশোধন করে খাওয়া, স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার এবং টয়লেট ব্যবহারের পর ও খাবার হাত দিয়ে ধরার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা কর্মসূচি পালন করে। একই সঙ্গে নদী দখল ও দূষণ রোধ, উপকূলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, গভীর ও আর্সেনিক-মুক্ত নলকূপ স্থাপন, স্কুল ও হাসপাতালের জন্য WASH (water, sanitation and hygiene) কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং জলবায়ু সহনশীল পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার কথা জোর দেওয়া হয়। এ দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে হবে, নইলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- ২২ মার্চেই কেন বিশ্ব পানি দিবস পালিত হয়?
- ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের একটি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ২২ মার্চকে বিশ্ব পানি দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে প্রতি বছর এ দিনে নিরাপদ মিঠা পানি ও স্যানিটেশনের গুরুত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা ও পদক্ষেপ জোরদার করা যায়।
- অপরিষ্কার পানি থেকে কী ধরনের রোগ হতে পারে?
- দূষিত পানি ও নোংরা স্যানিটেশনের কারণে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস এ, কৃমি সহ নানা অন্ত্রের সংক্রমণ হতে পারে। এসব রোগে বিশেষ করে ছোট শিশু, গর্ভবতী নারী ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষ বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
- বাংলাদেশে নিরাপদ পানীয় জলের অবস্থা কেমন?
- বাংলাদেশে পানি ও স্যানিটেশনের অনেক অগ্রগতি হলেও এখনো আর্সেনিক দূষিত নলকূপ, নদী ও খালের দূষণ, উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং বন্যা–ঘূর্ণিঝড়ে অবকাঠামো ক্ষতির কারণে অনেক গ্রাম ও শহুরে বস্তিতে নির্ভরযোগ্য নিরাপদ পানীয় জল পাওয়া কঠিন। এসব এলাকায় গভীর ও আর্সেনিক-মুক্ত নলকূপ, পাইপলাইন পানি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

