মূল কন্টেন্টে যান

আমরা নিয়মিত তথ্য যোগ ও যাচাই করছি। কোনো তথ্য অনুপস্থিত বা ভুল মনে হলে আমাদের জানান, আমাদের টিম কাজ করছে। জানান

MedIndex
World Tuberculosis Day awareness illustration showing lungs, TB bacteria, a healthcare worker and message to end TB

স্বাস্থ্য দিবসMarch 24

বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস

প্রতি বছর ২৪ মার্চ বিশ্ব যক্ষ্মা (টিবি) দিবস পালিত হয়। এই দিনটি বেছে নেওয়া হয়েছে ১৮৮২ সালের ২৪ মার্চের স্মরণে, যেদিন জার্মান চিকিৎসক ডা. রবার্ট কখ ঘোষণা করেন যে তিনি যক্ষ্মার জীবাণু Mycobacterium tuberculosis শনাক্ত করেছেন। তাঁর এই আবিষ্কার যক্ষ্মা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার পথ উন্মুক্ত করে এবং “কনজাম্পশন” নামে পরিচিত শতাব্দী পুরোনো মারাত্মক রোগটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝার সুযোগ দেয়।

এখনও যক্ষ্মা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সংক্রামক ঘাতক রোগ হিসেবে রয়ে গেছে। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ নতুন করে টিবি-তে আক্রান্ত হয় এবং আধুনিক চিকিৎসা থাকা সত্ত্বেও প্রতি বছর ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ এ রোগে প্রাণ হারায়, যদিও যক্ষ্মা আসলে প্রতিরোধযোগ্য ও নিরাময়যোগ্য একটি রোগ।

কেন গুরুত্বপূর্ণ

যক্ষ্মা সাধারণত ফুসফুসে আক্রমণ করে (পালমোনারি টিবি), তবে লিম্ফ নোড, হাড়, কিডনি, মস্তিষ্কসহ শরীরের অন্য অঙ্গেও ছড়াতে পারে (এক্সট্রা-পালমোনারি টিবি)। ফুসফুসের যক্ষ্মা রোগী কাশি, হাঁচি, উচ্চস্বরে কথা বলা বা থুথু ফেললে বাতাসে ক্ষুদ্র ড্রপলেটের মাধ্যমে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে এবং আশেপাশের মানুষ তা শ্বাসের সাথে গ্রহণ করলে সংক্রমিত হতে পারে। অতিরিক্ত ভিড়, কম বায়ু চলাচল, অপুষ্টি, এইচআইভি সংক্রমণ ও ডায়াবেটিস যক্ষ্মা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

বিশ্বব্যাপী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ১ কোটি মানুষের নতুন করে টিবি হয়েছে এবং প্রায় ১২ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা যক্ষ্মাকে একক সংক্রামক জীবাণুজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ করে তুলেছে। পাশাপাশি বহুঔষধ-প্রতিরোধী টিবি (MDR-TB), যেখানে প্রথম শ্রেণির সবচেয়ে শক্তিশালী ওষুধ দু’টির প্রতিও জীবাণু প্রতিরোধী হয়ে যায়, চিকিৎসাকে দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও জটিল করে তোলে।

বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ দিবস সবাইকে মনে করিয়ে দেয়—দীর্ঘদিনের কাশি বা ওজন কমাকে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করা দরকার, বিনামূল্যে মানসম্মত ওষুধ পাওয়া সম্ভব, এবং পুরো কোর্স ঠিকমতো শেষ করলে যক্ষ্মা সারানো যায়। একই সঙ্গে এটি ভয়, লজ্জা ও কুসংস্কার দূর করার বার্তা দেয়, যেন রোগীরা লুকিয়ে না থেকে সাহস নিয়ে চিকিৎসা নিতে পারেন।

ইতিহাস

মানবসভ্যতার শুরু থেকে যক্ষ্মা মানুষের মধ্যে ছিল, তবে ১৮৮২ সালের ২৪ মার্চ ডা. রবার্ট কখ প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করেন যে নির্দিষ্ট এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া (Mycobacterium tuberculosis) এ রোগের জন্য দায়ী। সেদিন ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রায় প্রতি সাতটি মৃত্যুর মধ্যে একটি যক্ষ্মাজনিত ছিল। তাঁর গবেষণার ফলেই পরবর্তীতে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি বিকাশ লাভ করে।

১৯৯০-এর দশকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন ২৪ মার্চকে বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেয় এবং পরবর্তীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এটিকে আনুষ্ঠানিক সচেতনতা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন স্লোগান যেমন “Yes! We can end TB” ইত্যাদি নিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য দেশভিত্তিক নেতৃত্ব, জনগণের অংশগ্রহণ এবং উন্নত পরীক্ষাকৌশল, ছোট মেয়াদের ওষুধ এবং কার্যকর ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো।

মূল তথ্য

কারণ

  • যক্ষ্মা রোগের কারণ ব্যাকটেরিয়া Mycobacterium tuberculosis
  • যা সাধারণত ফুসফুসে আক্রমণ করে
  • তবে অন্যান্য অঙ্গেও ছড়াতে পারে।

কীভাবে ছড়ায়

  • ফুসফুসের টিবি রোগী কাশি
  • হাঁচি বা জোরে কথা বলার সময় বাতাসে যে ড্রপলেট ছাড়ে
  • তা অন্যরা শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলে সংক্রমিত হতে পারে। হাত মেলানো বা একই প্লেটে খাওয়া দিয়ে টিবি ছড়ায় না।

বৈশ্বিক বোঝা

  • সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি মানুষ নতুন করে টিবি-তে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ১২ লক্ষ মানুষ মারা যায়
  • যা বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় বোঝা তৈরি করে।

নিরাময়যোগ্য রোগ

  • সাধারণ ড্রাগ-সাসসেপটিবল টিবি সাধারণত অন্তত ৬ মাসের নিয়মিত অ্যান্টিটিবি ওষুধের কোর্স সম্পূর্ণ করলে ভালো হয়ে যায়।

অধিক ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী

  • এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি
  • ডায়াবেটিস বা অপুষ্টিতে ভোগা মানুষ
  • ধূমপায়ী
  • টিবি রোগীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তি
  • কারাগারের বন্দি
  • স্বাস্থ্যকর্মী এবং অতিরিক্ত ভিড় ও বায়ু চলাচলহীন বাড়িতে বসবাসকারী মানুষ।

প্রতিরোধের উপায়

  • দ্রুত রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা
  • উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগকারীর প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা
  • হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
  • ভালো বায়ু চলাচল
  • কাশি শিষ্টাচার এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশে নবজাতকদের BCG টিকা প্রদান।

বাংলাদেশে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে বাংলাদেশ এখনও একটি উচ্চ যক্ষ্মা-প্রবণ দেশ; প্রতিবছর দেশটিতে বহু নতুন টিবি রোগী শনাক্ত হয় এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এ রোগে মারা যান। ঘনবসতিপূর্ণ শহর, বস্তি এলাকা, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, অপুষ্টি, ডায়াবেটিস ও শ্রমবাজারে অভিবাসন—এসব কারণে এখানে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ সরকার জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (National TB Control Programme – NTP) বাস্তবায়ন করছে, যা WHO সুপারিশকৃত DOTS কৌশল অনুসরণ করে। এ কর্মসূচির আওতায় সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বহু এনজিও ক্লিনিকে বিনামূল্যে টিবি পরীক্ষা ও ওষুধ প্রদান করা হয়। স্লাইম (কফ) পরীক্ষা, জিনএক্সপার্ট মেশিনের সাহায্যে দ্রুত পরীক্ষা এবং এক্স-রে দিয়ে রোগ নির্ণয় করা হয়; এরপর নির্ধারিত সময় পর্যন্ত স্থির ডোজের অ্যান্টিটিবি ওষুধ নিয়মিত খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, প্রয়োজনে স্বাস্থ্যকর্মী বা স্বেচ্ছাসেবক সরাসরি ওষুধ খাওয়া তদারক করেন।

গত দুই দশকে বাংলাদেশে টিবি শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা কভারেজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখনও অনেক মানুষ দীর্ঘদিনের কাশি বা ওজন কমাকে গুরুত্ব দেন না, অথবা প্রথমে অদক্ষ ‘ডাক্তারের’ কাছে যান। সামাজিক কলঙ্ক ও চাকরি হারানোর ভয় অনেককে পরীক্ষা থেকে বিরত রাখে। বহুঔষধ-প্রতিরোধী টিবিও একটি উদীয়মান সমস্যা, যার চিকিৎসার জন্য বিশেষ কেন্দ্র ও দ্বিতীয় সারির ওষুধ প্রয়োজন।

বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, NTP, পেশাজীবী সংগঠন, এনজিও ও কমিউনিটি গ্রুপগুলো র‌্যালি, বিনামূল্যে স্ক্রিনিং ক্যাম্প, টিভি–রেডিও টক শো, মসজিদ, কারখানা ও স্কুলভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রমের আয়োজন করে। দীর্ঘদিনের কাশি, রাতে ঘাম, জ্বর ও ওজন কমে যাওয়া—এগুলোকে টিবির সতর্ক সংকেত হিসেবে চেনা, দ্রুত পরীক্ষা করানো, পুরো ওষুধ কোর্স শেষ করা এবং রোগীর পাশে দাঁড়ানোর মতো বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এসব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

২৪ মার্চ কেন বিশ্ব যক্ষ্মা (টিবি) দিবস হিসেবে পালিত হয়?
১৮৮২ সালের ২৪ মার্চ ডা. রবার্ট কখ ঘোষণা করেন যে তিনি যক্ষ্মার জীবাণু Mycobacterium tuberculosis আবিষ্কার করেছেন। এই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণ করতেই প্রতি বছর ২৪ মার্চ বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালন করা হয়।
যক্ষ্মা কীভাবে একজন থেকে আরেকজনে ছড়ায়?
ফুসফুসের টিবি রোগী কাশি, হাঁচি, জোরে কথা বলা বা থুথু ফেলার সময় বাতাসে ক্ষুদ্র ড্রপলেট ছাড়ে, যার মধ্যে টিবি জীবাণু থাকতে পারে। আশেপাশের মানুষ এসব ড্রপলেট শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলে সংক্রমিত হতে পারে। হাত মেলানো বা এক প্লেটে খাওয়া দিয়ে টিবি ছড়ায় না।
যক্ষ্মার সাধারণ লক্ষণ কী কী?
দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কাশি (অনেক সময় কফ বা রক্তসহ), ওজন কমে যাওয়া, জ্বর, রাতে ঘাম, বুকব্যথা, ক্ষুধামন্দা ও দুর্বল লাগা—এসব যক্ষ্মার সাধারণ লক্ষণ। এক্সট্রা-পালমোনারি টিবি হলে লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া, কোমর বা পিঠে ব্যথার মতো অঙ্গভিত্তিক লক্ষণও দেখা যেতে পারে।
যক্ষ্মা কি সম্পূর্ণ ভালো হয়? চিকিৎসা কতদিন চলতে হয়?
হ্যাঁ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যক্ষ্মা সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। সাধারণ টিবির জন্য অন্তত ছয় মাস একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক একসাথে সেবন করতে হয়। উপসর্গ কমে গেলেও পূর্ণ কোর্স শেষ না করা পর্যন্ত ওষুধ বন্ধ করা যাবে না, নইলে রোগ ফিরে আসতে পারে এবং ওষুধ প্রতিরোধী টিবি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বাংলাদেশে যক্ষ্মার অবস্থা কেমন?
বাংলাদেশ এখনও উচ্চ যক্ষ্মা-প্রবণ দেশের মধ্যে রয়েছে, তবে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে সারাদেশে বিনামূল্যে পরীক্ষা ও DOTS চিকিৎসা দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের কাশি বা ওজন কমে গেলে দ্রুত পরীক্ষা করানো, পুরো ওষুধ কোর্স শেষ করা এবং রোগীকে সামাজিকভাবে সহায়তা করাই দেশে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি।

সম্পর্কিত স্বাস্থ্য দিবস

এই পাতা শেয়ার করুন