প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং দিবস পালিত হয়। এ দিনের মূল উদ্দেশ্য হলো সাবান দিয়ে নিয়মিত ও সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করা। বাড়ি, স্কুল, কর্মক্ষেত্র, বাজার ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে – সর্বত্র হাত ধোয়ার গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোই এই দিবসের মূল লক্ষ্য।
History
গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং দিবস প্রথম চালু হয় ২০০৮ সালে, গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং পার্টনারশিপ নামে একটি আন্তর্জাতিক জোটের উদ্যোগে। এ পার্টনারশিপে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাত যুক্ত আছে, যারা বিশ্বজুড়ে হাতের স্বাস্থ্যবিধি (hand hygiene) ও সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার প্রচারে কাজ করে। ২০০৮ সালটি ছিল "International Year of Sanitation" – সে বছরই হাত ধোয়া, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে এই দিবস চালু করা হয়।
শুরুর পর থেকেই গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং দিবস দ্রুত অনেক দেশে জনপ্রিয়তা পায়। বর্তমানে ১০০টিরও বেশি দেশে এ দিবস পালিত হয়, যেখানে স্কুলভিত্তিক অনুষ্ঠান, গণহাতে হাত ধোয়ার অনুষ্ঠান, কমিউনিটি সমাবেশ, নেতা-কর্মীদের অঙ্গীকার, গণমাধ্যম ক্যাম্পেইন ও সোশ্যাল মিডিয়া চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট থিম বেছে নেওয়া হয় – যেমন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি বা জরুরি পরিস্থিতিতে হাত ধোয়ার ভূমিকা ইত্যাদি।
গবেষণায় প্রমাণিত, সাবান দিয়ে ঠিকমতো হাত ধোয়া ডায়রিয়াজনিত রোগের ঝুঁকি প্রায় ৪০–৫০% পর্যন্ত কমাতে পারে এবং নিউমোনিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রায় ২০% কমায়। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া এখনো বিশ্বব্যাপী শিশু মৃত্যুর বড় কারণ। ছোলেরা, টাইফয়েড, তীব্র ডায়রিয়া ও কিছু ভাইরাসজনিত সংক্রমণ প্রতিরোধেও হাত ধোয়ার বড় ভূমিকা আছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও বিশ্বজুড়ে সবাইকে আবার নতুন করে সাবান দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়ার কথা গুরুত্ব দিয়ে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
আমাদের হাতে চোখে দেখা যায় না এমন অসংখ্য জীবাণু থাকে। টয়লেট ব্যবহারের পর, শিশুর পায়খানা পরিষ্কার করার পর, পশু-পাখি বা ময়লা-আবর্জনা ধরার পর, কাঁচা খাবার বা মাংস ধরার পর যদি সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত না ধোয়া হয়, তাহলে সেই জীবাণু সহজেই খাবার, পানীয়, মুখ ও অন্যান্য মানুষের শরীরে চলে যেতে পারে। এর ফলেই ডায়রিয়া, পেটের ব্যথা, বমি, জ্বর, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, সাবান ও পানি সাধারণত সস্তা ও সহজলভ্য জিনিস। তাই হাত ধোয়া এমন একটি প্রতিরোধমূলক পদ্ধতি, যা খুব অল্প খরচে ও ঘরে বসেই করা যায়। তবুও অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এখনো লক্ষ লক্ষ পরিবারের বাড়িতে সাবান আর পানিসহ একটি সাধারণ হাত ধোয়ার জায়গাও থাকে না। কোথাও বা সাবান থাকলেও মানুষ নিয়মিত ব্যবহার করেন না, বা সঠিক সময়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস তৈরি হয়নি।
গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে হাত ধোয়া শুধু ব্যক্তিগত কাজ নয়, সামষ্টিক দায়িত্বও বটে। সরকার ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর দায়িত্ব হলো বাড়ি, স্কুল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও হাসপাতালে পর্যাপ্ত পানি, সাবান ও হাত ধোয়ার স্টেশন নিশ্চিত করা। শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সঠিক কৌশলে (কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে দুই তালু, হাতের পেছন দিক, আঙুলের ফাঁক, নখের নিচ, বুড়ো আঙুল ও কবজি ভালোভাবে ঘষে ধোয়া) হাত ধোয়ার অনুশীলন শেখাতে পারেন। বাবা-মা ও যত্নদাতারা শিশুদের ছোটবেলা থেকেই টয়লেট ব্যবহারের পর, শিশুর পায়খানা পরিষ্কার করার পর, খাবার রান্না বা খাওয়ার আগে, ও বাইরে থেকে বাসায় ফিরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস তৈরি করতে পারেন।
এ দিবসটি বিশ্ব হাত পরিচ্ছন্নতা দিবস (৫ মে) থেকে কিছুটা আলাদা। গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং দিবস (১৫ অক্টোবর) মূলত সাধারণ মানুষ, পরিবার, স্কুল ও কমিউনিটির হাত ধোয়ার আচরণের ওপর জোর দেয়। অন্যদিকে বিশ্ব হাত পরিচ্ছন্নতা দিবস মূলত হাসপাতাল ও ক্লিনিক্যাল পরিবেশে ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের হাতের স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে কাজ করে, যাতে হাসপাতাল সংক্রমণ কমানো যায়।
মূল তথ্য
শুরুর বছর
- ২০০৮ সালে গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং পার্টনারশিপ গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং দিবস চালু করে।
ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া
- সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ডায়রিয়াজনিত রোগের ঝুঁকি প্রায় ৪০–৫০% এবং নিউমোনিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রায় ২০% কমাতে সাহায্য করে।
সহজ কিন্তু অবহেলিত
- অনেক পরিবারেই এখনো বাড়িতে সাবান ও পানিসহ আলাদা হাত ধোয়ার জায়গা নেই
- কিংবা থাকলেও নিয়মিত ব্যবহার করা হয় না।
দুটি ভিন্ন দিবস
- গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং দিবস (১৫ অক্টোবর) সাধারণ মানুষের হাত ধোয়ার অভ্যাস নিয়ে কাজ করে; বিশ্ব হাত পরিচ্ছন্নতা দিবস (৫ মে) মূলত হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মীদের হাতের পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দেয়।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া বহুদিন ধরেই শিশুদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর বড় কারণ হিসেবে পরিচিত। ঘনবসতিপূর্ণ বাসস্থান, কিছু এলাকায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি এবং হাত ধোয়ার অভ্যাসের দুর্বলতা সংক্রমণ বাড়িয়ে দেয়। অথচ সাবান ও পানি তুলনামূলক সস্তা; এমনকি যেখানে পাইপলাইনের পানি নেই, সেখানেও নলকূপ বা টিউবওয়েলের পাশে সাধারণ একটি হাত ধোয়ার স্টেশন তৈরি করা সম্ভব।
গত দুই দশকে বাংলাদেশ সরকার, ইউনিসেফ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন এনজিও ও উন্নয়ন অংশীদাররা পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (WASH) কর্মসূচির মাধ্যমে হাত ধোয়ার প্রচারে বড় ভূমিকা রেখেছে। স্কুলে আলাদা হাত ধোয়ার জায়গা তৈরি, কমিউনিটি ক্লিনিক ও বাজার এলাকায় হাত ধোয়ার স্টেশন বসানো, প্রাথমিক শিক্ষায় স্বাস্থ্যবিধি অন্তর্ভুক্ত করা, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং গণমাধ্যম ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বারবার হাত ধোয়ার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কোভিড-১৯ মহামারির পর হাত ধোয়ার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক স্কুল, দোকান, মসজিদ ও গণপরিবহনের আশপাশে সাবানসহ হাত ধোয়ার স্টেশন বসানো হয়, কোথাও কোথাও পা দিয়ে চেপে চালানো যায় এমন ট্যাপ বা স্থানীয়ভাবে তৈরি কম খরচের ডিভাইস ব্যবহার করা হয়। গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং দিবসকে সামনে রেখে এসব উদ্যোগ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয় এবং শিশুদের হাতে-কলমে সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অনুশীলন করানো হয়।
তারপরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক গ্রামীণ ও শহরের বস্তি এলাকায় এখনো প্রতিটি পরিবারে সাবান রাখা বা নিয়মিত ব্যবহার করার অভ্যাস নেই; পানি তুলতে কষ্ট হয় বলে কেউ কেউ খুব অল্প পানি দিয়ে তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে নেন, সাবান ব্যবহার করেন না। প্রচলিত অভ্যাসে অনেক সময় টয়লেট ব্যবহারের পর ও খাবার হাত দেওয়ার আগে হাত ধোয়া ভুলে যাওয়া বা শুধু পানিতে ধুয়ে ফেলার প্রবণতা দেখা যায়।
১৫ অক্টোবর গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে স্কুল সমাবেশ, র্যালি, দেয়াল পত্রিকা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, উঠান বৈঠক, মসজিদে খুতবার সঙ্গে বার্তা প্রচার, রেডিও-টিভি আলোচনার আয়োজন করা হয়। বার্তা থাকে – “টয়লেট ব্যবহারের পর এবং খাবার খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে”, “পরিষ্কার হাত মানে সুস্থ শিশু”, “সাবান আর পানি – জীবাণুর বিরুদ্ধে সস্তা কিন্তু শক্তিশালী অস্ত্র।”
পরিবারের পর্যায়ে করণীয়ের মধ্যে রয়েছে – টয়লেট ও রান্নাঘরের কাছাকাছি সাবান ও পানি রেখে একটি স্থায়ী হাত ধোয়ার জায়গা তৈরি করা; শিশুদের ছোটবেলা থেকেই গান গেয়ে বা গুনে গুনে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা; বাইরে থেকে বাসায় ফিরেই প্রথমে হাত ধোয়া; খাবার রান্না বা পরিবেশন করার আগে এবং খাওয়ার আগে হাত ধোয়া; এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের যত্ন নেওয়ার সময় (ডায়াপার বা পায়খানা পরিষ্কার করার পর) অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। এভাবে ধীরে ধীরে হাত ধোয়াকে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ করে তুললে বাংলাদেশে শিশুদের ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়াসহ অনেক সংক্রমণ কমানো সম্ভব।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- হাত ধোয়া রোগের ঝুঁকি কতটা কমায়?
- গবেষণায় দেখা গেছে, সাবান দিয়ে সঠিকভাবে হাত ধোয়া ডায়রিয়াজনিত রোগের ঝুঁকি প্রায় ৪০–৫০% এবং নিউমোনিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রায় ২০% পর্যন্ত কমাতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া থেকে বাঁচাতে এটি অত্যন্ত কার্যকর ও সস্তা উপায়।
- গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং দিবস ও বিশ্ব হাত পরিচ্ছন্নতা দিবসের পার্থক্য কী?
- গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং দিবস (১৫ অক্টোবর) মূলত সাধারণ মানুষ, পরিবার, স্কুল ও কমিউনিটিতে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়। অন্যদিকে বিশ্ব হাত পরিচ্ছন্নতা দিবস (৫ মে), যা WHO-এর নেতৃত্বে পালিত হয়, মূলত হাসপাতাল ও ক্লিনিক্যাল পরিবেশে ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের হাতের পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দেয়, যাতে হাসপাতাল-সংক্রমণ কমানো যায়।
- কোন কোন সময় সাবান দিয়ে হাত ধোয়া সবচেয়ে জরুরি?
- টয়লেট ব্যবহারের পর, শিশুর পায়খানা পরিষ্কার বা ডায়াপার বদলানোর পর, পশু-পাখি বা ময়লা-আবর্জনা ধরার পর, খাবার রান্না করার আগে, খাবার পরিবেশন বা খাওয়ার আগে, শিশুকে খাওয়ানোর আগে এবং বাইরে থেকে বাসায় ফেরার পর – এসব সময় অবশ্যই সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়া উচিত। রোগ ছড়ানোর সময় (যেমন ডায়রিয়া বা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব) নাক, মুখ বা চোখে হাত দেওয়ার আগে হাত ধোয়াও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

