প্রতি বছর ২৫ জুলাই বিশ্ব ডুবে যাওয়া প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। এ দিনের মূল লক্ষ্য হলো ডুবে যাওয়াকে একটি বড় কিন্তু অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা। নদী, খাল, পুকুর, হাওর-বাঁওড়, কূপ, ডোবা এমনকি ঘরের ভেতরের পানি ভরা টব বা ড্রামের পানিতেও প্রতি বছর সারা বিশ্বে বিপুল সংখ্যক মানুষ, বিশেষ করে শিশু, অল্প সময়ে ও নীরবে প্রাণ হারায়। তাই একে অনেক বিশেষজ্ঞ “নীরব মহামারি” বলে উল্লেখ করেন।
History
২০২১ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ “গ্লোবাল ড্রাউনিং প্রিভেনশন” বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং ২৫ জুলাইকে বিশ্ব ডুবে যাওয়া প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ডুবে যাওয়া নিয়ে এটিই ছিল প্রথম স্বতন্ত্র জাতিসংঘ প্রস্তাব, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতে গৃহীত হয়।
প্রস্তাবে স্বীকার করা হয় যে, ডুবে যাওয়া শুধু সাঁতার কাটার সময় নয়; বরং দৈনন্দিন কাজকর্ম—স্নান, কাপড় ধোয়া, পানি তোলা, নৌকায় চলাচল কিংবা বাড়ির আশপাশে খেলা—এসব সময়েও ঘটে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের মতো পানি-সম্পর্কিত দুর্যোগ বাড়ায় ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকিও আরও বেড়ে যাচ্ছে। তাই এ সমস্যা মোকাবিলায় কম খরচে কিন্তু কার্যকর কিছু পদক্ষেপ নিতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর আনুমানিক ২,৩৬,০০০ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, যা আঘাতজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। শিশুদের মধ্যে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি—বিশেষ করে ১–৪ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে, এরপর ৫–৯ বছরের শিশুরা। অনেক দেশে গ্রামীণ ও নদীবেষ্টিত এলাকায় ডুবে যাওয়া প্রায়ই ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া বা সড়ক দুর্ঘটনার চেয়েও বেশি শিশু মৃত্যুর কারণ, কিন্তু তারপরও এই বিষয়টি তুলনামূলক কম গুরুত্ব পায়।
ছোট শিশুর ডুবে যাওয়া বেশিরভাগ সময় খুব দ্রুত ও নীরবে ঘটে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তদারকি শিথিল হলেই শিশু বাড়ির পাশের পুকুর, ধানের জমির পাশের ডোবা বা পানি ভরা গর্তে গিয়ে পড়তে পারে। অনেক ঘরবাড়ি খোলা পানির খুব কাছে হওয়ায় ঝুঁকি আরও বাড়ে। সাঁতার শেখার সুযোগ, লাইফ জ্যাকেট, নিরাপদ নৌযান ও জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
ভালো খবর হলো, ডুবে যাওয়া অনেক বেশি প্রতিরোধযোগ্য। প্রমাণিত কার্যকর পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে—ছোট শিশুদের সব সময় একজন দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কের নজরদারিতে রাখা, বাড়ির আঙিনা বা আশপাশে নিরাপদ খেলার জায়গা তৈরি করা, কূপ ও গভীর গর্ত ঢেকে রাখা, পুকুর ও ঝুঁকিপূর্ণ জায়গার চারপাশে বেড়া বা ঘেরা তৈরি করা, বড় শিশুদের জন্য সাঁতার ও নিরাপদ উদ্ধার দক্ষতা শেখানো, নৌকায় চলাচলের সময় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং গ্রামে-গঞ্জে প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর (CPR) শেখানো।
মূল তথ্য
জাতিসংঘের স্বীকৃতি
- ২০২১ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে ২৫ জুলাইকে বিশ্ব ডুবে যাওয়া প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বিশ্বব্যাপী বোঝা
- প্রতি বছর আনুমানিক ২
- ৩৬
- ০০০ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়
- যার বড় অংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে।
শিশুদের উচ্চ ঝুঁকি
- বিশ্বব্যাপী ১–৪ বছর বয়সী শিশুরা ডুবে যাওয়ার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকে
- বিশেষ করে যেখানে বাড়ির কাছেই খোলা পানি থাকে।
দৈনন্দিন কাজেই বেশি ঝুঁকি
- বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে বাড়ির আশপাশে স্নান
- খেলা
- পানি তোলা বা নৌকায় চলাচলের সময়—শুধু ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার সময় নয়।
সহজ সমাধান
- বাড়তি তদারকি
- বেড়া
- নিরাপদ খেলার জায়গা
- সাঁতার শেখানো ও কমিউনিটি ক্রেশের মতো কম খরচের ব্যবস্থা নিলে অধিকাংশ শিশুর ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশ নদী, খাল, পুকুর ও জলাভূমিতে ঘেরা একটি দেশ। গ্রামীণ এলাকার অধিকাংশ বাড়িই কোনো না কোনো খোলা পানির আশপাশে অবস্থিত। ফলে ১–৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পানিতে ডুবে যাওয়া। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা কৃষিকাজ বা গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকেন, আর শিশু নিরবচ্ছিন্ন তদারকি ছাড়া আঙিনায় বা পুকুরের ধারে খেলতে গিয়ে পানিতে পড়ে যায়।
বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, কমিউনিটি-ভিত্তিক ক্রেশ বা আঁচল কেন্দ্র—যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছোট শিশুদের প্রশিক্ষিত কর্মীর তত্ত্বাবধানে রাখা হয়—গ্রামীণ এলাকায় শিশু ডুবে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। পাশাপাশি বড় শিশুদের জন্য সাঁতার ও বেঁচে থাকার কৌশল শেখানো (যেমন ভেসে থাকা, নিরাপদভাবে পানিতে ওঠানামা করা, সাহায্যের জন্য ডাকা ইত্যাদি) তাদের নিজের নিরাপত্তা বাড়ায়।
বিশ্ব ডুবে যাওয়া প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, এনজিও ও কমিউনিটি সংগঠনগুলো র্যালি, সচেতনতামূলক সভা, গণমাধ্যমে প্রচার, জীবনরক্ষাকারী কৌশলের প্রদর্শনী ও স্কুলভিত্তিক কর্মসূচির আয়োজন করে। বার্তাগুলোর মূল বিষয় থাকে—ছোট শিশুকে কখনোই একা বা বড় ভাইবোনের তত্ত্বাবধানে পানির ধারে না রাখা, আঁচল বা অনুরূপ ক্রেশে শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, বাড়ির পুকুর ও ডোবা যতটা সম্ভব ঘেরা রাখা, নৌকায় চলাচলের সময় অতিরিক্ত ভিড় এড়ানো ও লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার, এবং বড়দের সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি CPR শেখা।
পরিবারের জন্য বার্তা সহজ—মাত্র কয়েকটি সতর্ক পদক্ষেপ আপনার সন্তানের জীবন বাঁচাতে পারে। শিশুকে চোখের আড়াল না করা, নিরাপদ খেলার জায়গা তৈরি করা এবং স্থানীয় কমিউনিটি প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। সরকার, কমিউনিটি ও পরিবার একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে অগণিত প্রতিরোধযোগ্য ডুবে যাওয়ার মৃত্যু এড়ানো যাবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- বিশ্ব ডুবে যাওয়া প্রতিরোধ দিবস কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
- ২০২১ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে ২৫ জুলাইকে বিশ্ব ডুবে যাওয়া প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে প্রতি বছর এ দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে।
- বাংলাদেশে ডুবে যাওয়া কেন বড় উদ্বেগের বিষয়?
- বাংলাদেশে ঘন নদী, খাল, পুকুর ও জলাভূমির নেটওয়ার্ক রয়েছে এবং অনেক বাড়িই খোলা পানির একেবারে কাছাকাছি। গ্রামাঞ্চলে বাবা-মা প্রায়ই কৃষিকাজ বা গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকেন, আর শিশু একা বা পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়া আঙিনায় ও পুকুরের ধারে খেলতে গিয়ে পানিতে পড়ে যায়। এসব কারণে বিশেষ করে ১–৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে ডুবে যাওয়া।
- শিশুদের ডুবে যাওয়া প্রতিরোধে পরিবার কী করতে পারে?
- পরিবার চাইলে কয়েকটি সহজ পদক্ষেপ নিয়ে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক কমাতে পারে—ছোট শিশুকে কখনোই একা বা শুধু বড় ভাইবোনের জিম্মায় পানির ধারে না রাখা; তাদের নিরাপদ, ঘেরা জায়গায় খেলতে দেওয়া; সম্ভব হলে কূপ, ডোবা বা পুকুরের চারপাশে বেড়া দেওয়া; দিনের সময় কমিউনিটি ক্রেশ বা আঁচল কেন্দ্রে পাঠানো; বড় শিশুদের সাঁতার ও পানিতে নিরাপদ আচরণ শেখানো; আর নৌকায় চলার সময় অতিরিক্ত ভিড় এড়িয়ে শিশুদের লাইফ জ্যাকেট পরানো।

